আশ্রয় কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই
নয়—এটি নিরাপত্তা, সামাজিক সংগঠন, স্থায়িত্ব এবং সৃজনশীলতার
সূচনাবিন্দু। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় চার লক্ষ
বছর আগে মানুষের এক পূর্বপুরুষ গোষ্ঠী প্রথম পরিকল্পিতভাবে আশ্রয় নির্মাণের পথে
অগ্রসর হয়।
আমরা সবাই জানি যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা গুহার
ভেতরে বাস করতেন। আর সেগুলো তাঁরা জল, খাবারদাবার যেখানে প্রচুর
পরিমাণে পাওয়া যেত সেখানেই তৈরি করতেন।
মনে করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৮,০০,০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২,০০,০০০ পর্যন্ত ইউরোপে এক আদিম
জাতির বসবাস ছিল। তাদের স্বপক্ষেই প্রথম ঘরদোর বানিয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই
জাতিকে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস নামে আখ্যা দেওয়া হলেও তারা হোমো সেপিয়েন্স, না হোমো নিয়ানডারথ্যালেনসিস
প্রজাতির পূর্বসূরি ছিল, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। তবে প্রায় সবাই একমত যে, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা কেবল
প্রাকৃতিক আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করেনি; বরং তারা নিজেদের প্রয়োজন
অনুযায়ী আশ্রয় নির্মাণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছিল।
ফ্রান্সের টেরা আমাটা অঞ্চলে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রায় ৪০০,০০০ বছর পুরোনো একধরনের
ডিম্বাকৃতি কুঁড়েঘরের ভিতের হদিস পান। তেমনি ২০০০ সালে জাপানেও ৫০০,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই
ধরনের আদিম জাতি দ্বারা তৈরি আশ্রয়ের সন্ধান মেলে। উত্তর টোকিওর চিচিবু-র পাহাড়ি
অঞ্চলে এই ধরনের কুঁড়েঘরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয় যেগুলোর আশেপাশে মোট ত্রিশটা
আদিম মানব ব্যবহৃত পাথরের যন্ত্রপাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। এই কুটিরগুলির
ভেতরে আগুন ব্যবহারের চিহ্ন—বিশেষ করে চুল্লি বা hearth-এর নিদর্শন পাওয়া গেছে।
যদিও কিছু গবেষক মনে করেন, এসব চিহ্ন প্রাকৃতিক আগুনের ফলও হতে পারে, তবু সামগ্রিক বিন্যাস ও
কাঠামোগত পরিকল্পনা ইঙ্গিত দেয় যে এগুলো আসলে মানবসৃষ্ট আশ্রয়ই ছিল। লক্ষ লক্ষ
বছর পুরোনো নিদর্শনের ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। সময়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক ক্ষয়, ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ও
জলবায়ুর প্রভাব প্রমাণকে অস্পষ্ট করে তোলে। তবু টেরা আমাটা মানব ইতিহাসে
পরিকল্পিত আশ্রয় নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।
মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক গুহাকে বাসস্থান হিসেবে
ব্যবহার করে এসেছে। গুহা ছিল স্বাভাবিকভাবে নিরাপদ, শীত-গ্রীষ্ম থেকে
পরিত্রাণের আশ্রয়। কিন্তু প্রাকৃতিক গুহা সব অঞ্চলে মেলে না। এই সীমাবদ্ধতাই
মানুষকে বিকল্প সমাধান খুঁজতে বাধ্য করে।
নির্মিত আশ্রয় মানুষের বাসস্থানকে খাদ্য, জল এবং শিকারস্থলের
কাছাকাছি নিয়ে আসতে সাহায্য করে। এর ফলে মানুষের জীবনধারা আরও স্থিতিশীল হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি মানুষ ধীরে
ধীরে একটি স্থায়ী সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে শুরু করে।
বিখ্যাত স্থপতি ফিলিপ জনসন উক্তি করেছিলেন— ‘কৃষির পরেই আশ্রয় মানুষের
জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। খাদ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আশ্রয়ও।’
এই উক্তির গভীরতা
প্রাগৈতিহাসিক মানবজীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আশ্রয় মানুষকে শুধু রক্ষা করেনি, বরং তাকে সুযোগ করে দিয়েছে
নিত্যনতুন পরীক্ষা করার, ভাবার, নতুন কিছু আবিষ্কার করার। কাজের জায়গার
কাছাকাছি বসবাসের ফলে দৈনন্দিন জীবনে অতিরিক্ত শক্তি ও সময় ব্যয় কমে যায়, যা প্রযুক্তিগত ও
সাংস্কৃতিক বিকাশে সহায়ক হয়।
জাপানে ৫,০০,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো নির্মিত আশ্রয়ের যে দাবি একসময়
করা হয়েছিল, তা ২০০০ সালের পর গবেষণায় বাতিল বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে
৩৫,০০০ বছরের আগের জাপানি
মানববসতির প্রমাণকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে
প্রত্নতত্ত্ব একটি চলমান গবেষণাক্ষেত্র—নতুন তথ্য পুরোনো ধারণাকে বদলে দিতে পারে।
নির্মিত আশ্রয়ের উদ্ভব মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক নীরব, কিন্তু বৈপ্লবিক অধ্যায়।
এটি মানুষকে প্রকৃতির দাসত্ব থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করে আত্মনির্ভরতার পথে নিয়ে
যায়। চার লক্ষ বছর আগে নির্মিত সেই আদিম কুটিরগুলোই একদিন রূপ নেয় গ্রাম, শহর, দুর্গ ও আধুনিক স্থাপত্যে।
মানুষের ইতিহাস মূলত তার নির্মিত আশ্রয়ের ইতিহাসও—যেখানে নিরাপত্তা সৃজনশীলতা ও সভ্যতার বীজ একসঙ্গে অঙ্কুরিত হয়েছে। (চলবে)
<<
সূ চি প ত্র