akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প - শেষ ভাগ । শ্রাবণ ১৪৩৩

সুপ্তকৈলাস গুহার আহ্বানে
এর আগে যা ঘটেছিল— 
১ম পর্ব এবং ২য় পর্ব (দেখতে ক্লিক করুন)










নন্দিতা দত্ত

আগরতলা, ত্রিপুরা

তিনি উঠে বসে দেওয়ালের দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন আমার ভয় আমাকে ঘিরে ধরেছিল কিন্তু তোমরা আমাকে টেনে এনেছো এবার সাবধানে থাকবে জায়গাটা সাধারণ গুহা নয় 

সঞ্জীব হাঁপাতে হাঁপাতে বলল স্যার, এই সিঁড়িগুলো দিয়ে কোথায় যাওয়া  যায়

স্যার একটু চোখ ছোট করে সিঁড়ির মাথার অন্ধকারে তাকালেন পাথরের বিশাল খোদাইটা যেন নড়ে উঠল হালকা আলোয় ওপরটা হয়তো বেরোনোর পথবলে স্যার আরো বললেন, বা আরও অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে তন্ময় গলার স্বর নিচু করে বলল কিন্তু স্যার, ওখানে কিছু আছে আলোতেই দাগগুলো উজ্জ্বল হচ্ছে রূপম টর্চ ধরে দেখল সিঁড়ির গায়ে খোদাই করা চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে যেন আলোকিত হচ্ছে স্যার চাপা গলায় বললেন এখন ঠিক করতে হবে আমরা কি ফিরে যাব, নাকি সিঁড়ি বেয়ে আরও ভেতরে এগোব? চার বন্ধুর হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তে যেন গুহার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল পাথরের সিঁড়ির মুখটায় টর্চ ফেলতেই অদ্ভুত একটা দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল সিঁড়ির ধাপগুলো ঘিরে সারি-সারি কলসি একটার মুখ বাঁকা, একটার গায়ে ফাটল, কয়েকটার ঢাকনা যেন বহুদিন আগে খুলে গেছে এদের ওপর ধুলো নয় কালো ছাইয়ের আস্তরণ, যেন বহু বছর আগে আগুনে পুড়েছিল

স্যার তখন নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়ে বসে আছেন  শিবম  স্যারের কাঁধে হাত রেখে বলল স্যার, আপনি নড়বেন না আমরা দেখি কী আছে ওপরে রূপম তাকাল একবার স্যারের চোখের দিকে এখনও অদ্ভুত আতঙ্ক স্যারের চোখে মুখে কিন্তু তিনি মাথা নাড়লেন যাও তবে সাবধানে কলসিগুলো ছুঁয়ো না রূপম, তন্ময়, সঞ্জীব গভীর শ্বাস নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল সিঁড়িগুলো খুব সরু, এতটাই যে একবারে একজনই উঠতে পারে প্রথম ধাপেই কলসির সারি ডিঙোতে হল প্রতিটা কলসি থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরোচ্ছে যেন ভেতরে ফাঁকা, কিন্তু সেই ফাঁকা জায়গায় অনেক দিনের জমাট গন্ধ তন্ময় থেমে ফিসফিস করে বলল এগুলো কারা রেখেছিল? রূপম চাপা স্বরে বলল দেখে মনে হচ্ছে সিঁড়ির রক্ষক উপরের দুই ধাপ উঠতেই ওদের পা পড়ল মরচে ধরা লোহার বাক্সের কাছে পাঁচ-ছয়টা বাক্স এলোমেলো পড়ে কিছুটা খোলা, একটা সম্পূর্ণ চেপ্টা হয়ে গেছে মরচে ধরে সিঁড়িটা এত সরু যে বাক্সগুলো ডিঙোতেও সমস্যা হচ্ছিল 

সঞ্জীব একটা বাক্সের ঢাকনা একটু ঠেলে দেখতেই কেমন আওয়াজ হলো মনে হল ঢাকনার নীচে ধাতব কোনো পাত নড়ল রূপম চমকে উঠে বলল ধীরে! অনেক পুরোনো ভেঙে পড়তে পারে 

তবু কৌতূহল ওদের সামনে টেনে নিয়ে গেল তন্ময় হাঁটু গেড়ে একটি আধখোলা বাক্সের ভেতর টর্চ ফেলল টর্চের আলো পড়তেই ওদের তিনজনের নিঃশ্বাস আটকে গেল বাক্সের ভেতর রয়েছে ছেঁড়া, পুড়ে যাওয়া কিছু কাপড়, যেন কোনো বিশেষ পোশাকের টুকরো 

ছোট ছোট পাথরের ফলক, যেখানে অদ্ভুত চিহ্ন খোদাই করা মানুষের চোখ নয় এমন চোখের আকার আর মাঝখানে ধুলো ঢাকা একটি লোহা বাঁধানো চামড়ার খাতা সঞ্জীব আস্তে খাতাটা তুলল ধুলো উড়ে গেল, আর খাতার মলাটে লেখা কিছু অস্পষ্ট ছাপ তন্ময় কাঁপা গলায় বলল মানে জায়গায় যারা এসেছিল তারা কারা? কি উদ্দেশ্যে এসেছিল? তারা কি কোনো ডাকাত জলদস্যু?

সঞ্জীব টর্চ উঁচু করলসিঁড়ির উপরের জায়গাটায় আরও কিছু দেখা যাচ্ছে একটা বড় পাথরের বেদির মতো জায়গায় সারি সারি মানুষের মুখোশ 

সবগুলো অর্ধেক ভাঙা আচ্ছা এগুলো কি দিয়ে তৈরি? দেখে তো বোঝা যাচ্ছে না তুলে দেখতে হবে বলে এগিয়ে যায় সঞ্জীব সেই মুহূর্তেই নিচে থেকে শিবমের কণ্ঠ ভেসে এলো ভয়ে কাঁপা, তবু তীক্ষ্ণ রূপম!




 


 

 







স্যার আবার জ্ঞান হারাচ্ছেনতাড়াতাড়ি নেমে আয় তোরা তিনজন একত্রে তাকাল একে অন্যের চোখে জায়গায় আরো রহস্য আছে কিন্তু স্যারের কি হলো? ওরা দ্রুত বাক্স, কলসি, সিঁড়ি ডিঙিয়ে ছুটতে লাগল নিচে শিবম স্যারের মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে স্যার ফিসফিস করছেন ওরা উঠে আসছে কলসিগুলো ভাঙবে না ওগুলোই ওদের আটকে রেখেছিল 

তিনজনের মুখ সাদা হয়ে গেল স্যার কি করে জানলেন? স্যারের কাছে ম্যাপ আছে স্যার কি আগে এসেছিলেন? ধ্যাত্  স্যার কি করে আসবেন? হয়তো কোথাও পড়েছিলেন আমরা গুহার কথা বলায় তাই স্যার সঙ্গী পেয়ে কোন রহস্য উদ্ধার করবেন ভেবেছেন এমনও তো হতে পারে  এখন  আমরা কী করবো? স্যারকে নিয়ে ফিরে যাবার পথ খুঁজবো

চারজনই স্যারের গলার কাছে কান পেতে আছে স্যার অস্পষ্টভাবে ফিসফিস করছেন কলসিগুলো ভাঙবে না স্যারের গলায় এমন আতঙ্ক যে মনে হচ্ছিল তিনি শুধু কল্পনার কথা বলছেন না গুহায় যা আছে, স্যার তা দেখে ফেলেছেন রূপম বলল, স্যার, ওখানে অনেক কলসি ছিল আমরা ছুঁইনি স্যার কাঁপতে কাঁপতে বললেন এগুলো মানুষ যারা এখানে ঢুকেছিল তাদের স্মৃতি, পাপ, ভয়, ছায়া গুহা ওগুলো ধরে রাখে যখন কেউ আসল মুখ দেখে ফেলত, তখন কলসিতে বন্দি হত তন্ময় শিউরে উঠল তাহলে ওই মুখোশগুলো?

স্যার চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করলেন যারা পালাতে পারেনি! হঠাৎই পাশের অন্ধকারের দেয়াল জুড়ে খট্ খট্ একটা শব্দ চারজনই চমকে ঘুরে তাকাল টর্চ ফেলতেই দেখা গেল সিঁড়ির ওপারের অন্ধকারে রাখা মরচে ধরা বাক্সগুলোর মধ্যে একটার ঢাকনা ধীরে ধীরে নিজে থেকেই নড়ছে

সঞ্জীবের গলা শুকিয়ে গেল, চাপা স্বরে যেন বলছে ওটা তো আমরা খুলিনি রূপম বলল এত গা ঘেসে, হয়তো সিঁড়িতে ওঠার সময় পা লেগে গেছিল অনেকটা নিজেকে ভয় মুক্ত করতেই বলা তন্ময় মাথা নেড়ে বলল ভেতর থেকে কিছু নড়ছে 

শিবম তখনও স্যারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্যার চোখ বড় বড় করে বলে উঠলেন দৌড়াও ওটা স্মৃতি নয় ওটা যে ফিরে আসছে যাকে কলসিতে আটকানো ছিল! স্যারের গলার সেই আতঙ্কে চারজনের রক্ত হিম হয়ে গেল কিন্তু তারা দৌড়তে পারল না কারণ সিঁড়ির ওপার থেকে ধীরে খুব ধীরে একটা ছায়া নেমে আসতে শুরু করল পাঁচজনই একসাথে যেন দেখল শুধুই ছায়া কোনো মানুষের আকার নয়, কোনো পশুরও নয় 

মনে হল যেন অন্ধকার থেকে অন্ধকার খসে পড়ছে রূপম কাঁপা গলায় বলল ওটা ওটা কলসি থেকে বেরিয়েছে! স্যার দাঁত চেপে বললেন হ্যাঁ অন্য কলসিগুলো ভাঙবে না ওগুলো ভাঙলে সব বেরিয়ে আসবে ছেলেরা হতবাক ঠিক তখনই সঞ্জীব একটা ব্যাপার লক্ষ্য করল সিঁড়ির ডান দিকের দেয়ালটা সামান্য ভাঙা ফাটল দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে বাইরে থেকে আসা হাওয়া সঞ্জীব চিৎকার করে বলল এখানে ফাটল আছে! এইদিক দিয়ে বেরোনোর পথ থাকতে পারে! রূপম, তন্ময়, শিবম সবাই স্যারকে তুলে ধরল  ঠিক তখনই খটাং বেশ বড় জোরে একটা শব্দ হল ছায়াটা পুরোপুরি সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ওর কোনো মুখ নেই কোনো হাত-পা নেই 

কিন্তু ওর চারপাশে ঘন অন্ধকারের ঘূর্ণি আর মনে হচ্ছে যেন শত শত ফিসফিসানি একসঙ্গে কান ঘেঁষে কেউ বলছে ফিরে এসো/ ফিরে এসো চারজনই স্যারকে নিয়ে পেছনে সরে গেল সঞ্জীব ফাটলের দিকে টর্চ ফেলল শিবম বলল স্যারকে প্রথমে যেতে দেবোনা রূপম ভয়-এর গলায় বলল আমরা কি ওই ছায়ার সামনে পড়ব? সঞ্জীব বলল কোথায় ছায়া, আমরা এতক্ষণ ভুল ভেবেছি এটাই সত্যি তাকিয়ে দেখ কিছু নেই দৃঢ় গলায় সঞ্জীবের কথায় তখন সবার মনেই প্রশ্ন কোথায় ছায়া? ওরা আর প্রশ্ন করতে পারল না রূপম আর তন্ময় স্যারকে ফাটল পেরিয়ে এগিয়ে গেল ঠিক সেই মুহূর্তে ফাটলের ওপার থেকে বাতাসের জোয়ার শুরু হল জায়গাটা ভিতর থেকে বাতাস টানছে যেন একটা সুড়ঙ্গ আছে 

চারজন একসাথে এগিয়ে চললো কিছু দেখা যায় না এমন অন্ধকার লুটিয়ে পড়ল কয়েক সেকেন্ড পরে এবার হালকা  আলো ঢালু পথে ওরা  চারজন আর স্যার এসে পড়ল এক বড় চেম্বারে এখানে বাতাস আছে, ওপর থেকে ঝুলে থাকা  অনেক ফাটল আছে আর সামনে একটা বিশাল পাথরের দরজা সঞ্জীব হাঁপাতে হাঁপাতে বলল স্যার এত কিছু! গুহা আসলে কী? স্যার ধীরে চোখ খুললেন  চোখে ক্লান্তি কিন্তু এবার এক অদ্ভুত দৃঢ়তা তিনি বললেন এটা কেবল গুহা নয় এটা এক ধরনের জাদুঘর যেখানে মানুষরা নিজেদের ছায়াকে 

কলসিতে আটকে রাখত যারা ফিরত না তাদের মুখোশই থেকে যেত রূপম বিস্ময়ে বলল তাহলে আমাদের সামনে দরজার ওপাশে কি আছে? কিছু আছে কি? যা মনে করার নয় তাই ভেবেছি, ভেবে ভেবে মিথ্যেটা কে সত্যি মনে করেছি

গুহার স্যাঁতসেঁতে পথ ধরে সঞ্জীবরা এগিয়ে যায় স্যারকে শিবম ধীরে ধীরে টেনে আনছিল, স্যার কিছুটা সামলে উঠেছেন কিন্তু চোখে এখনও আতঙ্কের ঘন ছায়া তবু সঞ্জীব শক্ত গলায় বলেছিল যা- হোক, ওসব বাদ দাও ওই আলোটা ওইটুকুই এখন আমাদের বাঁচার পথ চল উপরটা পর্যন্ত একবার দেখি সিঁড়ি শেষ হয়ে তাদের পা পড়ল এক বড় পাথরের চাতালে চাতালের পাশে বাঁদিকের গুহাটা তুলনামূলক উজ্জ্বল ঘুটঘুটে অন্ধকার নয়  ভেতরে শ্যাওলার গন্ধ, ভেজা পাথরের গা  উপরে কোথাও এক ফাটল, সেখান থেকে লম্বা আলোর রেখা গড়িয়ে পড়ছে তারা এগোতেই আলোটা উজ্জ্বল হচ্ছিল যেন কেউ পথ দেখাচ্ছে 

একসময় উঁচু থেকে আবার নিচের দিকে একটা ঢালু অংশে পৌঁছল সবাই শিবম স্যারকে জড়িয়ে ধরে ধীরে নামছিল নিচে পৌঁছতেই চারজন থমকে দাঁড়িয়ে গেল চোখ বড় বড় হয়ে গেছে  এটা কোনো সাধারণ জায়গা নয় যেন শতাব্দী পুরোনো ধ্বংসাবশেষ ভাঙা খিলান, পোড়া পাথরের দাগ, একটা হলের মতো বড় ঘর দেয়ালের গায়ে শ্যাওলা আর অদৃশ্য লিপির খোদাই

সঞ্জীবের গলাটা শুনা গেল স্যার এটা কি সত্যিই প্রাচীন?

          স্যার কিছুক্ষণ চোখ ছোট করে তাকিয়ে ছিলেন হালকা কাঁপা গলায় বললেন হ্যাঁ এগুলো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই নয় এই গুহার উপরে নিশ্চয়ই কখনও বড় কোন প্রাসাদ ছিল মাটি ধ্বসেই ক্ষয়ে ক্ষয়ে সব নীচে নেমে এসেছে

চারজন  ভয়ে ভয়েতাকাতে লাগল এক পাশ থেকে আরেক পাশ দিয়ে যেতেই দেখা গেল বড় বড় চৌবাচ্চা একটা, দুটো, তিনটে চারটে! সবগুলোরই তলায় পাথরের খোদাই যেন রাজাদের স্নানাগার  মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত দাগ মনে হচ্ছিল সেখানে একসময় সুগন্ধ তেল বা ভেষজ রাখা হতো  হঠাৎ তন্ময় চেঁচিয়ে উঠলো আমরা আলো পেয়ে গেছি এই তো আকাশ উপরে ছাদের বড় অংশ ভেঙে পুরো একটা খোলা বৃত্ত হয়ে গেছে সেখান থেকে আলো ঢুকছে, গাছপালা জঙ্গল হয়ে ছাদ ভেদ করে নেমে এসেছে বাকি অংশটুকু যেন কোনো জঙ্গল মন্দিরের ভগ্নস্তূপ মনে হচ্ছিল অজস্র বছরে কালের আবরণ ধরে এই গুহার গভীরে পুরো একটা রাজপ্রাসাদ ডুবে গেছে আলোর দিক অনুসরণ করে তারা আরও একটু এগিয়ে গেল খুব সরু একটি ফাটল যেন প্রকৃতি হঠাৎ করে দরজা খুলে দিয়েছে বাতাসের টান টের পাওয়া গেল

সঞ্জীব প্রথমে মাথা গলিয়ে তাকাল আরে! বাইরে আলো ওরা একটুখানি সোজা হয়ে, একটু বেঁকে, একটু গিয়ে তারা বেরিয়ে এল পা পড়তেই চোখ ঝলসে উঠল গা ছমছমে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে তারা পৌঁছেছে সবুজের অপরূপ রাজ্যে সূর্যের আলো ঝলমল করছে দূরে নীল আকাশ, নিচে নরম মাটির গন্ধ, দুরে চওড়া নদী জলের রূপালি রেখা কেমন ঝকঝক করছে 

চারদিকে ঘন সবুজ অরণ্য, যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ, লতা, ছায়া, বাতাস তন্ময় হাঁফাতে হাঁফাতে বলল আমরা সত্যিই বাইরে চলে এলাম? শিবম স্যারের দিকে তাকাল স্যার বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন সেই দিগন্তের দিকে মুখে অস্বস্তি নয়ভয় নয় এবার একরাশ শান্তি ধীর গলায় স্যার বললেন হয়তো যা দেখেছি সেটা শুধু কল্পনা ছিল কিন্তু এই রাজবাড়িটা এটা সত্যি ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটা হারানো যুগ আজ আমাদের সামনে আবার ফিরে এল

চারজন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো  পেছনে অন্ধকার পেরিয়ে গুহার সামনে আকাশভরা আলো আর তাদের পায়ের নিচে সেই হারানো রাজ্যের ছাই সামনে এগিয়ে দাঁড়াতেই ওরা দেখল মনু নদী অনেকটা চওড়া হয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে স্যার অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মিনিট পাঁচেক পর বললেন তখনো ভারতবর্ষ ভাগ হয়নি এখন দিকটা বাংলাদেশ ম্যাপটা মনে করার চেষ্টা কর স্যার তাহলে এটা কি সেই রাজবাড়ি? ইন্দ্রমাণিক্য রাঙ্গাউটিতে প্রাসাদ বানিয়েছিলেন রাজধানী ছিল রাঙ্গাউটি রাজার দীঘি তো আছে আর শিবমন্দিরের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু এখনো আবিষ্কার হয়নি কেউ কি আসেনি ভয়ে? দ্যাখ এগুলো নিয়ে অনেক গবেষণা দরকার আমরা আজকে এখানে যেভাবে এলাম, আগে কেউ এসেছে কিনা জানা নেই

কিন্তু স্যার যদি কেউ এসে থাকতো, এই গুহার কথা জানতো তাহলে লোকমুখে প্রচারিত হতো! কিন্তু এটা তো হয়নি আমরা শুনিনি এখন পর্যন্ত সঞ্জীব কথাটা বলে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে 

আমার খুব জল তেষ্টা আর খিদে পেয়েছে এখন আমরা কি করে ফিরবো সেটা ভাব সবাই শিবমের কথা শুনে সবার জল তেষ্টা পেয়ে গেল

সবই ঠিক আছে আমরা ফিরবো কি করে? পুরো জঙ্গল এটা ঠিক কোন দিক সেটাও বুঝতে পারছিনা আমাদের কাছে একটা রাস্তা আছে অনেক সময় লাগবে       

সেটা কি? তন্ময়ের কথায় রূপম জিজ্ঞেস করে সবাই তন্ময়ের কথায় তার মুখের দিকে তাকালো থানায় ফোন করতে পারি, ওরা এসে আমাদের রেসকিউ করুক সঞ্জীব সাথে সাথে বলে 

এটা ভালো বলেছিস এখন বারোটা বাজে আমাদের গুহা পেরিয়ে এখানে আসতে তিনঘণ্টা লেগেছে রেসকিউ টিম খবর পেয়ে জোগার যন্ত্র করে এখানে পৌঁছুতে ঘণ্টা দুয়েক তারপর গুহার ভেতর দিয়ে এসে আমাদের নিয়ে গুহায় আসার পথ দিয়েই ফিরতে পারেন বা এই পাহাড়ি পথে স্যার আপনি কি বলেন

তোরা ঠিক ভাবছিস কিন্তু আমার কি হয়ে গেল, আমি কি দেখলাম কেন এতটা ভয় পেলাম সেটাই বুঝতে পারছিনা  আমি আগাগোড়া কেন এমন বিকৃত চেহারা দেখলাম অসুস্থ হয়ে গেলাম তোদের বোঝা হয়ে তোদের ঝামেলা বাড়ালাম

স্যার আপনি এমন কেন বললেন? হয়তো আপনি কোন মুভি দেখেছিলেন কখনো, বা গুহার ভেতরে এমন ঘটনা হয় কখনো সাবকনসাসে ভেবেছিলেন আপনি না থাকলে আমাদের আজকের অভিযান কখনো সম্ভব হতো না

আচ্ছা থানায় ফোন কর, ফোনটা রিং হলে আমায় দে আমি কথা বলবো  পরের চারঘণ্টা তাদের রুদ্ধশ্বাসে কেটেছে থানায় ফোন করতেই বড়বাবু অনিমেষ দাস প্রথমে আজগুবি বলে ফোন রেখে দিচ্ছিলেন স্যার নিজের নাম বলায়, বড়বাবু আর অবিশ্বাস করেন কি করে চারঘণ্টা পর রেসকিউ টিম এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে আস্তেআস্তে চারদিকের আলো কমে আসছে পাঁচজন ক্লান্ত অবসন্ন খিদে তেষ্টায় কি করবে? কিছুক্ষণের মধ্যে মাথার উপর হেলিকপ্টারের আওয়াজে ওদের মুখে হাসি ফোটে

বড়বাবু অনিমেষ দাস ওদের জায়গা থেকে নড়তে না করেছে হেলিকপ্টার তাদের উদ্ধার করতে আসছে গুহায় হামাগুড়ি দিতে হবেনা হেলিকপ্টার একটা চক্কর কেটে ওদের অবস্থান দেখে এরা একদম জঙ্গলের ধার ঘেষে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকে এবার হেলিকপ্টার নেমে পড়তেই, ওরা উঠে বসে পড়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে স্কুল মাঠে হেলিকপ্টার থেকে ওরা নেমে আসে সারাদিনের ধকলে প্রত্যেকেই  বিধ্বস্ত সোমনাথ স্যার আর তার চার ছাত্রকে অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে থানায় বড়বাবু অনিমেষ দাস অপেক্ষায় দিন তিনেক পরে দূরদর্শন ত্রিপুরায় খবরে বিস্তারিত জানা গেল, হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা গুহায় আটকে পড়া স্যার সোমনাথ সহ ছাত্রদের কথা গুহার কিছু ফুটেজ গুহার মুখে পাহাড় দেশের বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ, ইতিহাস, ভুগোল, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার লোক সবাই একে একে আসছেন মনু নদীর চর ধরে নিত্য কত মানুষের আনাগোনা সাধারণ মানুষের যাওয়ার অনুমতি নেই সোমনাথ স্যারের মুখে ছাত্রদের সাহস আর বুদ্ধির কথা

সত্যিই কি ইন্দ্রমানিক্যের প্রাসাদ? স্যার সোমনাথ ভাবেন তন্ময়, শিবম, সঞ্জীব, রূপম ফাইন্যাল পরীক্ষা প্রস্তুতিতে ব্যস্ত গবেষণা চলছে ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীরা নতুন কিছু জানার অপেক্ষায় পর্যটকের জন্য কবে দরজা খুলবে কেউ জানে না স্যার সোমনাথ এখনো ভাবেন সেই হঠাৎ ভেসে আসা দেহ চোখ আর জলের ঢেউ আসলে কি গুহায় ছিল?