এটি কেবল দেহ আচ্ছাদনের
কৌশলই নয়—বরং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন, জৈব বিবর্তন, সামাজিক গঠন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের
সূচনালগ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৪০০,০০০ বছর আগে আদিম মানবগোষ্ঠী নিজেদের অনাবৃত দেহ আবৃত করার
উপায় উদ্ভাবন করেছিল বলে নৃতত্ত্ববিদদের একটি
অংশ অনুমান করেন।
প্রাগৈতিহাসিক মানুষ তখনও
বয়নকৌশল বা সূক্ষ্ম সেলাই প্রযুক্তি আয়ত্ত করেনি। ফলে তাদের পোশাক ছিল
সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদাননির্ভর। গাছের ছালের নমনীয় অংশ
শুকিয়ে বা পিটিয়ে নরম করা হত তখন। গাছের বড়ো পাতা-লতাও অস্থায়ী আবরণ হিসেবে গায়ে জড়াত আদিম মানবেরা। তাছাড়া পশুর চামড়া ও
লোম সংগ্রহ করত। শিকার করা প্রাণীর চামড়া শুকিয়ে, কখনও চর্বি মেখে নরম করে নেওয়া হত। জন্তুজানোয়ারের শিরা ও
শক্ত স্নায়ু দিয়ে পোশাক সেলাই বা বাঁধনের কাজ করত। এই পোশাকের
প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাপ সংরক্ষণ (thermoregulation) এবং পরিবেশগত
সুরক্ষা— বিশেষত হিমযুগীয় শীত, তীব্র বাতাস ও বৃষ্টিপাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা।
প্লাইস্টোসিন যুগে পৃথিবীতে
বহুবার তুষারযুগ এসেছে ফিরে ফিরে। আফ্রিকার তুলনামূলক উষ্ণ অঞ্চল থেকে মানুষ
যখন ইউরেশিয়ার শীতল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন শুধুমাত্র শরীরের স্বাভাবিক লোমের (body hair) ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে
পড়ে। ওদিকে বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার ফলে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরও তুলনামূলক কম রোমাবৃত হয়ে ওঠে। ফলে মানুষের কিছু না কিছু
কৃত্রিম আবরণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই সময় থেকেই পোশাক
কেবল আরামদায়ক বিলাসিতা নয়,
বরং বেঁচে থাকার অত্যাবশ্যকীয় প্রযুক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
যদিও ৪০০,০০০ বছর আগের সরাসরি পোশাকের নিদর্শন সংরক্ষিত নেই (কারণ চামড়া ও উদ্ভিদ উপাদান সহজে
নষ্ট হয়ে যায়), তবুও কিছু পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া
গেছে এর স্বপক্ষে। ১৯৮৮ সালে রাশিয়ার কোস্টেনকি (Kostenki) অঞ্চলে প্রায় ৩০,০০০ বছর পুরোনো হাড়ের তৈরি সেলাই সূচ খুঁজে পাওয়া যায়। এই
সূচগুলোর চোখও (eye) ছিল,
যা নির্দেশ করে সেই যুগে সুতো বা স্নায়ু দিয়ে চামড়া জোড়া
লাগানো হত। এটি প্রমাণ করে যে ওই সময়ের মানুষ মাপ
অনুযায়ী কাটা ও সেলাই করা পোশাক ব্যবহার করত। অর্থাৎ পোশাক তখন কেবল মোড়ানো চামড়ার টুকরো নয়, বরং কারিগরি
দক্ষতায় তৈরি বডি-ফিটিং আবরণ।
মজার কথা বলি, আধুনিক পরীক্ষাগারে মানব-পোশাকের প্রাচীনত্ব নির্ণয়ে এক অভিনব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহৃত
হয়েছে—উকুনের (lice) জিনগত বিশ্লেষণ। মানুষের শরীরে
দুই ধরনের উকুন দেখা যায়—মাথার উকুন ও শরীরের উকুন। দ্বিতীয় প্রকারের উকুনেরা মানুষের পোশাকে বাস করে। নৃতত্ত্ববিদ রালফ কিটলার, ম্যানফ্রেড কায়সার ও মার্ক স্টোনকিং উকুনের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখেন, শরীরের উকুন মাথার উকুন থেকে আলাদা হয়ে গেছে আনুমানিক ১,০৭,০০০ বছর আগে। অপরাপর কিছু বিশ্লেষণে অবশ্য এই সময়সীমা আরও
পুরোনো—প্রায় ৫৪০,০০০ বছর পর্যন্ত ধরা হয়েছে। যেহেতু শরীরের উকুনকে বাঁচতে
হলে পোশাকের প্রয়োজন, তাই তাদের বিবর্তনীয় বিভক্তির সময়কালকে মানব পোশাক
ব্যবহারের সূচক হিসেবে ধরা হয়। এটি কিন্তু জীববিজ্ঞানভিত্তিক
এক গুরুত্বপূর্ণ পরোক্ষ প্রমাণ।
ধীরে ধীরে পোশাক-পরিচ্ছদেরও
প্রকারভিত্তিক বিবর্তন ঘটে। তার পরিচয় তখন শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সুরক্ষা
কবচ নয়, সামাজিক প্রকারভেদের পরিচায়কও বটে।
লিঙ্গভেদে, বয়সভেদে, গোত্রীয় পরিচয়, শিকারি বা পশুপালক, সামাজিক আচার ও রীতিনীতির সূচক হয়ে ওঠে এই পোশাক। পরবর্তীতে অলংকার, রঙ,
পুঁতি ও নকশা যুক্ত হয়ে মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়।
খ্রিস্টপূর্ব ৪০০,০০০ বছর আগের মানব পোশাকের সুনির্দিষ্ট নিদর্শন না থাকলেও প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব ও জিনতত্ত্ব মিলিয়ে একটি যৌক্তিক চিত্র পাওয়া যায়। পোশাক মানব বিবর্তনের এক মৌলিক প্রযুক্তি, যা মানুষকে পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী গোষ্ঠী বিস্তারে সাহায্য করেছে। এই
আবিষ্কার ছিল মানব সভ্যতার প্রথম দিকের
‘বায়োটেকনোলজিক্যাল মিউটেশন’। আর তা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, বরং প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকারই
কৌশল।