কিন্তু রবিবার সকালে দিল্লিওয়ালাদের
ঘুম ভাঙে দেরি করে।একটা সিটে ওরা দুজনে বসতেই অর্কর মোবাইল বেজে ওঠে। পকেট থেকে মোবাইল
বার করে চোখ বড়ো বড়ো করে অর্ক রিয়াকে বলে, “অজিতাভদা! এতক্ষণে তো ওর ব্যাঙ্গালুরুতে ফিরে যাবার কথা।
আবার পৌঁছ সংবাদ দেবার মতো ভদ্রতা কবে শিখল কে জানে!”
মোবাইলের স্ক্রিনে
আঙুল বুলিয়ে কল তুলে অর্ক বলে, “গুড মর্নিং, অজিতাভদা! পৌঁছে গেছ?... না? মানে? ফ্লাইট মিস করলে? ঘুম থেকে উঠতে পারনি?...
ওহ্, তা বেশ! তাহলে আছ আজকের দিনটা… এখন যাবে নাকি কোথাও? আমি আর রিয়া রাস্তায়…মানে
মেট্রোতে…চলেছি ভুলি ভাটের… না না ভুলি ভাটিয়ারি কি মহল নামের একটা জায়গায়। … চলে আসবে?
হ্যাঁ, এসে পড়ো। দারুণ হবে! তাহলে ঝান্ডেওয়ালান মেট্রো স্টেশনের নীচেই দেখা হচ্ছে…
আচ্ছা আচ্ছা, বেরিয়ে পড়ো… হ্যাঁ, আজ লাঞ্চ এখানেই কোথাও সেরে নেব। এসো দাদা।”
মোবাইল পকেটে গুঁজে
রেখে অর্ক রিয়াকে জানায়, “অজিতাভদা আসছে। মেট্রো স্টেশনেই থাকবে। সাতসকালে নাকি জামা
মসজিদ ঘুরতে গিয়েছিল। তাই খুব বেশি দূরে নেই বলেই মনে হয়।”
“কাছেই আছেন অজিতাভদা?
আচ্ছা, তাঁর না আজ ফিরে যাবার কথা ছিল?”
“ছিল তো! কিন্তু ফ্লাইট
ক্যান্সেল। আজকাল প্লেনে যান্ত্রিক গোলযোগ খুবই বেশি হচ্ছে। ওরা নাকি রাতের দিকের ফ্লাইট
দিচ্ছিল, অজিতাভদা আগামীকাল সকালে একই ফ্লাইট চেয়ে টিকিট পেয়েও গেছে। গাড়িতে উঠে এয়ারপোর্ট
রওনা দিয়েছিল, তখনই জানতে পারে যে ফ্লাইট বাতিল। বাকিটা দেখা হলে জানা যাবে। আরও কিছু
রসায়নের জ্ঞান তুই পেয়ে যাবি নিশ্চয়ই। এবার তোর বিজ্ঞানী হওয়া ঠেকায় কে।”
***
“ভুলি ভাটিয়ারী মহলে
রাতে আসতে হবে বুঝলি অর্ক। গুগল সার্চ করে দেখলাম ওখানে নাকি ভূত আছে!” দেখা হতেই উত্তেজিত
গলায় বলে অজিতাভ।
“কচু আছে। ভূত-টুত
সব বাজে কথা। আসলে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ্ তুঘলক শিকারে এসে এইখানে বিশ্রাম করার
জন্য একটি ছোট্ট আশ্রয়স্থল বানান। ভুলি ভাটিয়ারি নামকরণ কেমন করে হল, সেই নিয়ে অনেক
মতান্তর আছে। এক মহিলা নাকি রাস্তা ভুল করে এখানে ঢুকে পড়ে, তারপর ফিরে না যেতে পেরে
এখানেই মারা যায়। লোকে বলে তার প্রেতাত্মা এখনও ঘুরে বেড়ায় এই মহল বা বাড়ির আশেপাশে।”
রিয়া ইতিহাসের জ্ঞান উজাড় করে দেয়।
“ওরে ব্বাবা, তোর যা
ইতিহাসের জ্ঞান দেখছি, বিজ্ঞান ছেড়ে ইতিহাস পড়লেই তো হত!” বলে হেসে ওঠে অর্ক।
অজিতাভ নিজের পেটে
হাত বুলিয়ে বলে, “খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে রে। ভূতের পাল্লায় পড়ার আগে বরং একটু কিছু
পেটে দিয়ে নিই, নাকি? ওই তো দেখছি সামনে একটা চাইনিজ খাবারের দোকান আছে। চল, চাউমিন
পাওয়া যায় কি না দেখি।”
অজিতাভকে চাউমিনের
দোকানের দিকে যেতে দেখে রিয়া আর অর্কও ওর পিছু নেয়।
ওদের কাছ থেকে অর্ডার
নিয়েই দোকানের তরুণ ছেলেটি কড়াই গ্যাসের অভেনের ওপর রেখে সামান্য তেল ঢেলে পেঁয়াজ,
পেঁয়াজ পাতা, ক্যাপসিকাম, গাজরের টুকরো ভাজতে থাকে। দ্রুত হাতে সেগুলো নাড়াচাড়া করতে
করতে সেদ্ধ চাউমিন কড়াইতে ঢেলে ভাজতে থাকে পাচক। একেবারে শেষ দিকে একটা বড়ো কৌটো থেকে
এক খাবলা সাদা গুঁড়ো ছড়িয়ে দিতেই অজিতাভ পাচকের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “ওরে সামলে
সামলে, অতটা আজিনোমটো ঢালিস না বাপ! পেটে সহ্য হবে না।”
তরুণ পাচক ভাষা না
বুঝে ভ্রূ কোঁচকায়, “ক্যায়া হুয়া সাহাব? চিল্লাতা কিউঁ?”
“আরে চিল্লাতা ইস লিয়ে
কি তুমি ইতনা জ্যাদা আজিনোমটো ডালা ভাই!”
তরুণটি একটা কথাও না বলে কড়াই থেকে তিনটে প্লেটে
চাউমিন ঢালতে থাকে। ধোঁয়া ওঠা চাউমিনের ওপর নাক রেখে অজিতাভ বলে, “আহা, বেশ গন্ধ বেরিয়েছে।
ব্যাটার হাতটা ভালোই মনে হচ্ছে।”
অর্ক কাঁটা চামচ দিয়ে
একটু চাউমিন মুখে তুলে বলে, “অজিতাভদা, তুমি যা চেঁচালে, তাতে মনে হল চাউমিনের কড়াই
থেকে ভূত বেরিয়ে এসেছে ধোঁয়ায় ভর করে।”
“আরে না, মাত্রাতিরিক্ত
কিছুই ভালো নয়। বেশি মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট শরীরে একসঙ্গে গেলে পেটখারাপ হয়ে ফ্লাইট
মিস করি আর কি!”
রিয়া মৃদু আপত্তি করে
বলে, “এই যে বললেন আজিনোমটো, তারপর বলছেন মনো-সোডিয়াম…”
“একই জিনিস তো! এটা
একটা লবণ, মানে নুন অর্থে যে লবণ জানি, সেটা নয়। আজিনোমটো হল গ্লুটামিক অ্যাসিডের সোডিয়াম
সল্ট। একটা কথা মনে রাখবে, নানা ধরনের সল্টের ব্যবহারের গুণে রান্না করা খাবারের স্বাদ
আর গন্ধ বদলে যায়। তাই রান্না মানেই হচ্ছে রসায়নের খেলা। রসনা পরিতৃপ্তি করতে হলে রসায়নটাও
জানতে হবে, বোনটি।” অজিতাভ খাবারে মন দেয়।
অর্ক অনেকটা চাউমিন
মুখে পুরে বলে, “তোমার সব রাস্তাই কি রসায়নে এসে শেষ হয়ে যায় অজিতাভদা? এখন কি বলবে
যে চাউমিন বানিয়ে দিল যে প্যাংলা ছেলেটা, সেও একজন রসায়নবিদ?”
“অভ্যাসে, অজ্ঞাতে
রসায়ন শিখে ফেলেছে। হয়তো তাকে বিজ্ঞানী বলা যাবে না, কিন্তু ও জানে কোন সময় কোন লবণ
বা মশলা মেশালে চাউমিনের পদটা অতি উৎকৃষ্ট হবে খেতে। বড়ো বড়ো হোটেলে শেফদের কিছুটা
বিজ্ঞান অবশ্যই শিখে নিতে হয়, তবে সাধারণ মানুষ কিন্তু ঠেকে শেখে, অভিজ্ঞতায় জেনে ফেলে
সব। যেমন ধর রান্না করার কায়দা, সে তো আর একদিনে মানুষ শিখে ফেলেনি। হাজার হাজার বছর
ধরে শেখা রান্নার বিদ্যে তো বিশাল বিশাল রসায়ন জানা বিজ্ঞানীকে কাত করে দিতে পারে।
তবে হ্যাঁ, আমাদের মতো লেখাপড়া জানা মানুষদের উচিত বিজ্ঞান সচেতন হয়ে রান্নাবান্নায়
হাত দেওয়া। যাক, তত্ত্বকথা ছাড়, রিয়া নাকি দারুণ চাউমিন রান্না করে শুনেছি!” রিয়ার
দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় অজিতাভ।
প্লেটের ওপর পড়ে থাকা
কয়েকটা চাউমিন চামচে কায়দা করে তুলছিল রিয়া। অন্যমনস্ক চাউনিতে বলে, “আজিনোমটো আমরা
বাড়িতে রাখি না। মা বলে, ওতে নাকি ক্যানসার হয়। আমি ব্যবহার করি বাজার চলতি চাউমিন
মশলা। অনলাইনে পাওয়া যায়। সত্যি কি আজিনোমটোতে ক্যানসার হয়, অজিতাভদা?”
অর্ক অজিতাভর হয়ে উত্তর
দেয়, “এসব হচ্ছে মোবাইলে রিল দেখে প্রাপ্ত জ্ঞান। কে আর পরীক্ষা করে দেখেছে যে বেশি
বেশি আজিনোমটো খেলে ক্যানসার হয়? চিনে ওরা খাবারে প্রচুর আজিনোমটো ব্যবহার করে। তারা
কি সব ক্যানসারে মারা যায়?”
অর্ককে থামায় অজিতাভ।—
“দাঁড়া দাঁড়া, বকিস না মেয়েটাকে। অনেকেই মনে করে যে আজিনোমটো বেশি খেলে ক্যানসার হয়।
কিন্তু এর সপক্ষে যুক্তি বেশ দুর্বল। বেশি না খেলেই হল। যে আজিনোমটো বাজারে পাওয়া যায়,
তা হল মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেটের ক্রিস্টাল এবং কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তা তৈরি
হয় না। এটি অল্প ব্যবহারে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা কম। আজিনোমটো পঞ্চম স্বাদ দেয় জিভে।
চারটে স্বাদ—টক, ঝাল নুন এবং মিষ্টি ছাড়াও আরও একটা স্বাদ মানুষের জিভে সংবেদন তোলে,
যাকে বলা হয় উমামি। শব্দটা এসেছে জাপানি ভাষা থেকে, যার অর্থ হল মাংসজাতীয় একধরনের
স্বাদ, এটা বলে বোঝানো মুশকিল।”
“মানে এইমাত্র যে পঞ্চম
স্বাদটা আমরা জিভে পেলাম, সেটা? ভালোভাবে বুঝতে হলে আরও এক প্লেট করে চাউমিন অর্ডার
করি?” সুযোগ বুঝে বলে অর্ক।
মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি
জানিয়ে রিয়াকে বোঝায় অজিতাভ, “মাশরুম খেলে আমরা যে স্বাদটা পাই, সেটাই হল উমামি স্বাদ।
এর কারণ হল প্রাকৃতিকভাবেই মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট। আবার
টম্যাটোতেও একই পদার্থ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়, এমনকি চিজেও। মাস স্কেলে আজিনোমটো
বানাবার পিছনে একটা গল্প আছে।”
পকেট থেকে মোবাইল বার
করে দাম জিজ্ঞেস করে ইউ.পি.আই পেমেন্ট করে দেয় অজিতাভ। তারপর গল্পটা শুরু করে।
“জাপানের বায়োটেকনোলজি
কোম্পানির এক কর্তা নাকি বাড়িতে বউয়ের বানানো উপাদেয় স্যুপ খেয়ে জিজ্ঞেস করেন, স্যুপ
বানাতে কী কী উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ভদ্রলোকের স্ত্রী জানান— তিনি একধরনের সমুদ্রজাত
উদ্ভিদ ফুটিয়েছেন স্যুপ তৈরির সময়। ভদ্রলোক বিজ্ঞানী ছিলেন। সেই উদ্ভিদ ল্যাবে নিয়ে
গিয়ে সেদ্ধ করে তরল পদার্থ ফুটিয়ে তার কেলাস তৈরি করে দেখেন, আসলে বস্তুটি হচ্ছে গ্লুটামিক
অ্যাসিড। গ্লুটামিক অ্যাসিডকে নিউট্রালাইজ করতে তিনি ব্যবহার করলেন সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড।
অ্যাসিড আর বেসের বিক্রিয়ায় পাওয়া গেল নিষ্ক্রিয় মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট। সঙ্গে সঙ্গে
ভদ্রলোক রাসায়নিক বস্তুটির পেটেন্ট করে ফেললেন। ব্যস, আর দেখে কে? আস্ত একটা কোম্পানি
খুলে গেল জাপানে—‘আজিনোমটো গ্রুপ অফ কোম্পানিজ’ নামে আজ সারা বিশ্বে যা সুপরিচিত। এই
স্বাদের নামও কোম্পানির মালিক দিয়েছিলেন—উমায়ি, যার জাপানি ভাষায় অর্থ হল সুস্বাদু।
পরে উমামি বলে শব্দটি পরিচিত হতে থাকে।”
অজিতাভর গল্প শেষ হতেই
অর্ক মন্তব্য করে, “এবার যদি আমরা বিজ্ঞান ছেড়ে ভিতরে না যাই, তবে কিন্তু সন্ধে নেমে
যাবে আর ফিরোজ শাহ্র ভূত থাম থেকে বেরিয়ে এসে রিয়ার ঘাড় মটকে দেবে। চলো ভিতরে যাওয়া
যাক।”
রিয়া রেগে গিয়ে বলে,
“ভূত তোমার ঘাড় মটকে দিতে পারে অর্কদা, কারণ একটা সুন্দর গল্পের শেষে এই ভূত-টুতের
প্রসঙ্গ না আনাই ভালো। সন্ধে হতে ঢের বাকি।”
অর্ক গলা নামিয়ে বলে,
“দেখেছিস ভিতরটা কেমন গা ছমছমে রহস্যে ঘেরা! ভূতরা কি আর সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা করবে
বলে মনে করছিস? আজিতাভদার গল্প শুনে ওরাও এখন তোর ঘাড় মটকে দিয়ে বলে উঠতে পারে, আহ্-হা,
কী উমায়ি রক্ত রে! ওদের আর আজিনোমটোর দরকার পড়বে না।”
অজিতাভ অর্কর কান মলে
দেয়।— “বেশি বকিস না। আমাদের সবার শরীরে যে মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট আছে, তা জানিস? পড়িস
তো কোন ছাই অর্থনীতি নিয়ে! ওকে জানতে দে।”
রিয়া অর্কর দিকে চোখ
পাকিয়ে বলে, “ঠিক হয়েছে। আচ্ছা অজিতাভদা, গ্লুটামিক অ্যাসিড কীভাবে তৈরি হয় বড়ো স্কেলে,
মানে ইন্ডাস্ট্রিতে?”
“যেভাবে সুগার ফারমেন্ট
করে, মানে গেঁজিয়ে মদ বানানো হয়, অনেকটা সেরকম। ভুট্টা বা আখ থেকে যে চিনির রস পাওয়া
যায়, তাতে ইস্ট অর্থাৎ ছত্রাক মিশিয়ে দিলেই গেঁজানো শুরু হয়ে যায়। এই ছত্রাকরা চিনি
খেয়ে নিয়ে গ্লুটামিক অ্যাসিড তৈরি করে। পদ্ধতিটা খুব একটা জটিল নয়।”
“তাহলে তো আজই বাড়িতে
আজিনোমটো কিনে আনতে হবে চাউমিন বানাবার জন্য, তাই না?”
“একদম তাই। তবে আগামীকাল
আমার ফ্লাইট। তোমার বানানো চাউমিন খাওয়া আমার কপালে নেই। অন্তত এবারের জন্য।”
ওরা তিনজন ঢুকে পড়ে
ভুলি ভাটিয়ারি কি মহলে।