কারণ ও জানে, জল ভরে গেলেই সেন্সর জলতল বুঝে মোটর থামিয়ে দেয়, জল আর উপচে পড়ে না ফিল্টার থেকে। এদিকে সেন্সর খারাপ হয়ে যাওয়ায় মোটর থামার নাম নেই। রিয়া ফিল্টারের বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ করে দেয়। মোটর বন্ধ হলে কিছুক্ষণ পর জল পড়া থেমে যায়, কারণ জলের তল ততক্ষণে নেমে গিয়েছে।
রিয়ার বাবা খুব সকালে মর্নিং ওয়াকে যান। সেলফ লক থাকায় দরজাটা টেনে দিলেই সেটা বন্ধ হয়ে যায়। চাবি তিনি সঙ্গে নিয়ে যান। দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ আসায় রিয়া সদর দরজার দিকে ছোটে। বাবাকে দেখেই সে বলে, “জানো বাবা, ওয়াটার ফিল্টারটা খারাপ হয়ে গেছে। আমি সুইচ বন্ধ করে দেওয়ায় জল পড়া বন্ধ হয়েছে।”
পা থেকে ওয়াকিং-শু খুলতে খুলতে রিয়ার বাবা অধ্যাপক সমীরণ সেন সামান্য হাসেন। তারপর বলেন, “আজই খারাপ হবার ছিল? এদিকে তোর মিনুমাসি আবার আজই আসছে দুপুরের ফ্লাইটে। আমার একটা মিটিং পড়ে গেছে আর্জেন্ট। আর.ও. সার্ভিস করে যে মেকানিক, তার মোবাইল নম্বর দিয়ে রাখছি, ফোন করে সারিয়ে নিস। আজ কি তোর কলেজ আছে?”
“কলেজে তেমন ইম্পরট্যান্ট ক্লাস কিছু নেই। অর্কদাও রয়েছে বাড়িতে। ও বলল, সামনের সপ্তাহে নাকি কলকাতা ফিরে যেতে পারে। একটু বাইরে যাবার কথা ভাবছিলাম দুজনে। কিন্তু বাবা, মিনুমাসি কে? আমি কি তাঁকে দেখেছি?” উৎকণ্ঠার ছাপ রিয়ার গলায়।
রিয়ার বাবা বসার ঘরের দিকে এগোতে থাকেন। একটু চিন্তিত দেখায় তাঁকেও। সোফায় বসে বলেন, “তুই দেখেছিস ছোটবেলায়। তোর মায়ের দূরসম্পর্কের এক বোন হন মিনুদি। আমার চাইতেও বয়সে তিনি বড়ো। মিনুদির একমাত্র ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। উনি ছেলের কাছে যাবেন দিল্লি হয়ে। ওই দেশেই মিনুদির এক নাতনি জন্মেছে সদ্য।”
“মিনুমাসিকে আনতে যাবে কে? মা কি যাবে? তোমার তো কাজ আছে বললে।”
আলো নিভে গেল অধ্যাপকের মুখে।— “সেটাই সমস্যা রে! তোর মায়ের অফিসে অডিট চলছে। অফিস কামাই করলে তার চলবে না। এদিকে আমরা কেউ না গেলে মিনুদি অসুবিধায় পড়ে যাবেন।”
“কুছ পরোয়া নেই, প্রফেসর সাহাব। আমি চলে যাচ্ছি এয়ারপোর্ট। তোমার গাড়ি নিয়েই চলে যাব না-হয়।” কোন ফাঁকে অর্ক উঠে এসেছে শোবার ঘর থেকে।
“না রে, অর্ক। গাড়িটা দু-চার জায়গায় নিয়ে যেতে হবে আমাকে। আর দিল্লির রাস্তার সঙ্গে কলকাতার রাস্তা গুলিয়ে ফেলিস না। একটু অভ্যস্ত না হলে মুশকিল। একটা কাজ কর, তোরা দুই ভাইবোনে চলে যা বরং, ক্যাব নিয়ে নিস।”
রিয়া চেঁচিয়ে ওঠে, “একদম না। ক্যাব না নিয়ে বরং মেট্রোতে চলে যাই। কোন টার্মিনালে আসবে ফ্লাইট?”
“টার্মিনাল ওয়ান। হ্যাঁ, ওখানে মেট্রো কানেক্টিভিটি আছে ভালোই, সময় কম লাগবে। তবে ফেরার সময়ে কিন্তু ক্যাব নিবি। মিনুদি খুব খুঁতখুঁতে।”
বাবার কথা শুনে ভ্রূ কুঁচকে যায় রিয়ার।— “খুঁতখুঁতে? মানে পারফেকশনিস্ট?”
অর্ক বিজ্ঞের মতো জানায়, “খুঁতখুঁতে মানে পারফেকশনিস্ট হতেও পারে, নাও পারে। অনেক খুঁতখুঁতে মানুষ সব কিছুতেই আপত্তি তোলে, যা দেখে তা-ই তার অপছন্দ হয়। মনে হচ্ছে যে মাসির আগমন ঘটছে, তিনি এই প্রকারের।”
রিয়ার বাবা অর্কর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে ওয়াটার ফিল্টার মেকানিকের নম্বর রিয়াকে মোবাইলে শেয়ার করে বলেন, “ফিল্টার রিপেয়ার করিয়ে তবেই যাস মাসিকে আনতে। অর্কও বাড়ি আছে, অসুবিধা হবে না।”
মেকানিক এসে পড়ার আগেই অর্ক ওয়াটার ফিল্টার পর্যবেক্ষণ করে রিয়াকে জানায়, “ছয় মাস পার হয়ে গেছে ফিল্টার বদলানোর তারিখের। মেকানিককে জানিয়ে দে যে ফিল্টার কার্ট্রিজগুলোও যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এতদিন যে জল খেয়ে আসছিলি, তা দূষিত ছিল।”
রিয়া একটু ভয় পেয়ে যায়।— “জানতাম না তো! কার্ট্রিজ বছরে একবার বদলায় জানি, কিন্তু লক্ষ করিনি যে ফিল্টারের গায়ে পেন দিয়ে বদলানোর তারিখ লেখা রয়েছে।”
“সাধারণত কেউই এই বিষয়টা লক্ষ রাখে না। মেকানিকরা নিজেরাই ফোন করে চলে আসে। তাতে অবশ্য ওদের দুটো টাকা রোজগার হয়। সে যাক গে, এই যে কার্ট্রিজগুলো লাগানো আছে, স্বচ্ছ প্লাস্টিকের কভারের মধ্যে দিয়ে দিব্যি দেখা যাচ্ছে, ওগুলো কী আর তাদের কী কাজ সেই সম্পর্কে কতটা ধারণা আছে তোর?”
রিয়া অপ্রতিভ হয়ে ঘাড় নেড়ে জানায় যে সে জানে না। অর্ক তাকে আশ্বস্ত করে— “ঠিক আছে, না জানাটা অপরাধ নয়। আর.ও. মানে যে রিভার্স অসমোসিস, তা তুই নিশ্চয়ই জানিস। মূলত এই পদ্ধতিতে জল মেশিনে পরিস্রুত হয়ে আসে। প্রথমেই লক্ষ করে দ্যাখ, কলের অপরিস্রুত জল এসে ঢুকছে একটা ফিল্টারে, যেটা মেশিনের বাইরে রাখা আছে। একে বলা হয় সেডিমেন্ট ফিল্টার, যা মাটি বা অন্যান্য নোংরা আটকে দেয়। মোটামুটি ৫ মাইক্রনের চাইতে বেশি কোনও কণাকে আটকে দিতে পারে এই ধাপটি। এই ফিল্টার পার করে মেশিনের মধ্যে জল যাচ্ছে একটা কার্বন ফিল্টারে। রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়া হয় এখানে।
“কী থাকে এই কার্বন ফিল্টারে? এর মধ্যে রয়েছে অ্যাক্টিভ চারকোলের গুঁড়ো। অসমোসিস প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক। ইস্কুলের পাঠক্রমে এই প্রক্রিয়া পড়ানো হয়।”
রিয়া অর্ককে থামিয়ে দেয়।— “দুটো বিভিন্ন ঘনত্বের দ্রবণের মাঝে যদি একটা সেমি পারমি-অ্যাবল মেমব্রেন রাখা হয়, মানে একটা ঝিল্লি, তার মধ্যে দিয়ে কম ঘনত্বের তরল বেশি ঘনত্বের তরলের দিকে প্রবাহিত হবে।”
অর্ক উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।— “চমৎকার বাংলা বলছিস! অসমোসিসকে বাংলায় বলে অভিস্রবণ। তবে অনেক বাঙালিই এই প্রতিশব্দ বলতে পারবে না, জানি। রিভার্স অসমোসিস হল উলটো ব্যাপার, অর্থাৎ বেশি ঘনত্বের থেকে কম ঘনত্বের তরলের যাত্রা। কিন্তু এমনি এমনি তো আর এটা ঘটবে না, তার জন্য চাই চাপ সৃষ্টি করা। অপরিস্রুত জলের মধ্যে মিশে থাকে নানা দ্রবীভূত বস্তু। পাম্পের সাহায্যে সেমি পারমি-অ্যাবল মেমব্রেনের মধ্যে দিয়ে জল পাঠানো হয় উলটোদিকে। তাই রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়াতে জলে দ্রবীভূত কণা, কিছু কীটাণু এবং অন্যান্য পেস্টিসাইড, যা জলে মিশে থাকে, তা সহজেই ছেঁকে ফেলা যায়। এই মেমব্রেন তৈরি হয় সেলুলোজ পদার্থ দিয়ে, যেমন কাঠের আঁশ।
“পরের ফিল্টারটি হল কার্বন ফিল্টার। কার্বনের একটা ধর্ম হল জলের মধ্যে উপস্থিত অপেক্ষাকৃত ভারী ধাতুদের সে আটকে দেয়। যেমন সিসা হল একটা জলে মিশে থাকা ক্ষতিকারক ধাতু। সিসার মতো মার্কারিও একটি বিষাক্ত ধাতু, সেটাও আটকে যাবে চারকোল ফিল্টারে। চারকোল কী তা মনে আছে নিশ্চয়ই?”
রিয়া আগ্রহী হয়।— “হ্যাঁ। চারকোল হল বিশুদ্ধ কার্বন, অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে কাঠ পুড়িয়ে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে কার্বন পুড়ে ছাই হয়ে যায় না।”
“সঠিক। জলের ফিল্টার বানানোর কারখানাগুলো নারকোলের মালা পুড়িয়ে সাধারণত অ্যাক্টিভ চারকোল তৈরি করে। অ্যাক্টিভ চারকোলের এক-একটি অণুর সংস্পর্শে সিসার মতো ধাতু এলেই বিক্রিয়া হয়। ধাতুর লবণ থেকে ধাতু আলাদা হয়; একে বলে ‘আয়ন এক্সচেঞ্জ’। এবার প্রশ্ন করতে পারিস, ধাতুর ধনাত্মক আয়ন আলাদা হয়ে কার্বন ফিল্টারে আটকে গেলে পরিস্রুত জলে ঋণাত্মক আয়ন তো বেড়ে যাবে। তাহলে একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ধরা যাক, জলে লেড সালফেট মিশে আছে। এই রাসায়নিক বস্তুটা জলে সহজেই মিশে যায়। অ্যাক্টিভ চারকোলের সংস্পর্শে এসে লেড আলাদা হয়ে গেল, সালফারের তাহলে হবেটা কী? জলে ভেসে বেড়ায় কিছু স্বাধীন ধনাত্মক ধাতু বা হাইড্রোজেন। সালফারের সঙ্গ খুব সহজেই নিয়ে ফেলে এই অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকারক ধাতু, কিংবা হাইড্রোজেন। কাজেই জল আবার তড়িৎ নিরপেক্ষ হয়ে যায়।
“এবার দ্যাখ, কার্বন ফিল্টার থেকে বেরিয়ে জল যাচ্ছে আর একটা ফিল্টারে, যাতে ব্যক্টিরিয়া বা অন্যান্য অতিক্ষুদ্র জীবাণু আটকে দেওয়া যায়। সাধারণত এই ফিল্টারে এক মাইক্রনের চাইতে ছোটো জীবাণু সব আটকে যায়। অনেক ফিল্টারে আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি ব্যবহার করে কীটাণু মেরে ফেলার ব্যবস্থাও থাকে।”
রিয়া প্রশ্ন করে, “রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়ায় জল পরিস্রুত হবার সময় বেশ কিছু জল বাইরে বেরিয়ে যায় আর একটা নল দিয়ে। এইটা কেন হয় একটু বলবে?”
“মেমব্রেনে যে ধাতুর আয়ন, কীটাণু এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক রাসায়নিক আটকে যায়, তাদের বাইরে বার করে দিতে হয় জল দিয়ে ধুয়ে। জল পাম্প করে এইভাবে ফিল্টারদের পরিষ্কার রাখা হয়। এর ফলে অনেকটা জল নষ্ট হয় ঠিকই, কিন্তু সেটা মানুষের মঙ্গলের জন্য। আগে প্রতি লিটার পরিস্রুত জল তৈরি করতে গিয়ে প্রায় দুই লিটার জল বর্জিত হত আর.ও. সিস্টেমে। এখন উন্নত আধুনিক মেশিনে অনেকটাই কম জল বর্জিত হয়। প্রতি লিটার বিশুদ্ধ জল প্রতি প্রায় আধ লিটারে নামিয়ে আনা গিয়েছে। জল খুব মূল্যবান, তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
“অর্কদা, এবার একটা কথা বলো, জল ফিল্টার করতে গিয়ে নানা প্রয়োজনীয় মিনারেল, যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়, তা হারিয়ে যায়। তাহলে আর.ও. ওয়াটার পান করা কতটা সেফ?”
“এইজন্য আরও একটা বিশেষ সিলিন্ডার লাগানো থাকে আর.ও.-তে। সেখানে প্রয়োজনীয় মিনারেল আগে থেকেই ভরা থাকে। জলে মিশতে থাকে, তাই পরিশেষে আমরা যে জল পাচ্ছি, তাতে মিনারেলের অভাব হয় না।”
রিয়া বিজ্ঞের মতো মন্তব্য করে, “পৃথিবীতে পানীয় জলের সমস্যা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মাথাপিছু পেয় জলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দূষণের কারণে এবং জনসংখ্যার চাপে আগামী পৃথিবীর কাছে জলের চাহিদা মেটানোটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ।”
“বেশ কিছু দেশ আছে, যেখানে পানীয় জল আহরণ করা হয় বর্জিত জল আবার রিসাইকল করে, যেমন ইসরায়েল। সমুদ্রের লোনা জল অত্যাধুনিক আর.ও. সিস্টেমে পরিস্রুত করে তবেই পানের যোগ্য করে তোলা হয় সেখানে। স্নানাগার এবং শৌচাগারের জলও তারা নষ্ট করা বিলাসিতা বলে মনে করে।” চিন্তিত দেখায় অর্ককে।
রিয়া নাক সিটকে বলে, “টয়লেটের জল থেকে খাওয়ার জল? অ্যাহ্!”
“হ্যাঁ, টয়লেটের জল। নাক সিটকাচ্ছিস দেখে মনে হচ্ছে তোকে রিভার্স অসমোসিস প্রক্রিয়া বোঝানোটা বৃথা গেল। এতক্ষণে তোর বুঝে যাবার কথা যে, টয়লেটের জলে যে দূষিত দুর্গন্ধময় পদার্থ থাকে, তার সবটাই ফিল্টার করে একেবারে গন্ধবিহীন স্বাদু জলে পরিণত করা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তোদের এই রান্নাঘরে রাখা ওয়াটার ফিল্টার দিয়ে কাজ হবে না। এখানে তুই ফাইভ স্টেজ ফিল্টার দেখতে পাচ্ছিস, আর ইসরায়েলে যে ব্যবস্থার কথা শোনালাম, তা দশ-বারোটা স্টেজে ফিল্টার করা হয়। সেই জলে মিনারেল মিশিয়ে তবেই একেবারে মানব স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী পানীয় জল তৈরি করা হয়। এবার মনে হয় ফিল্টার মেকানিককে ডেকে নেওয়া উচিত, নইলে বিকেলে মিনুমাসি এসে আমাদের দুজনের কান মলে দেবে।”
রিয়া উপহাসের ভঙ্গিতে বলে, “কুছ পরোয়া নেহি, আমি মার্কেট থেকে আর.ও. ওয়াটার অর্ডার করে দেব। নীল রঙের বড়ো বড়ো পাঁচ লিটারের জারে এসে যাবে সামান্য দামে।”
“সেটা যে আর.ও. ওয়াটার হবেই, তুই জানলি কী করে? একেবারেই ওই দিকে পা মাড়াস না। ভালো কোম্পানি না হলে কলের অপরিশোধিত জল ভরতি করে দিব্যি চালিয়ে দেয় লোকে। খুঁতখুঁতে মিনুমাসি এই নিয়ে বাড়িতে তাণ্ডব করলে ব্যাপারটা খুব একটা ভালো হবে না। নে, আর দেরি করিস না। আমাদের এয়ারপোর্ট যেতে হবে।”