বিজ্ঞান বিচিত্রা । ফাল্গুন ১৪৩২

মহেঞ্জোদারো প্রাচীন সিন্ধু উপত্যকার নগর বসতির ডিজিটাল চিত্র  

সিন্ধু সভ্যতার বিলুপ্তির কারন খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা । 












পুলকরঞ্জন

চক্রবর্তী

পশ্চিম মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ


 

বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা গুলোর মধ্যে  সিন্ধু সভ্যতা অন্যতম একটি সভ্যতা। অনুমান করা হয় মিশরীয় সভ্যতার পরে পরেই জন্ম নিয়েছিল সিন্ধু সভ্যতা। সিন্ধু  সভ্যতাকে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতাও বলেন কেউ কেউ।

অনুমান করা হয়, সিন্ধু সভ্যতার কালপর্ব খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং পাকিস্তানে এটি বিকশিত হয়েছিল সিন্ধু নদের অববাহিকায়। সম্ভবত সেই কারনেই এই সভ্যতার এমন নামকরণ হয়েছিল। এই সভ্যতার পরিচিতি আছে 'হরপ্পা সভ্যতা' নামেও। প্রায় ১৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের এই সভ্যতা স্বাভাবিকভাবেই সমসাময়িক অন্যান্য সভ্যতার থেকে আকারে ছিল সরচেয়ে বড়।

সিন্ধু নদী ছিল এই সভ্যতার প্রধান প্রাণশক্তি, যা কৃষি, বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন জীবনকে সমর্থন করে সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। যদিও সিন্ধু সভ্যতার বিকাশে ঘগ্গর নদীর ভূমিকাও অস্বীকার করা যাবে না

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় মহেঞ্জোদারো শহরে উঁচু উঁচু অনেক মাটির ঢিবি ছিল। স্থানীয়রা বলতেন 'মৃত মানুষের ঢিবি'বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পুরাতত্ত্ব বিভাগের লোকেরা ওই স্থানে বৌদ্ধস্তূপের ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধান করতে মাটি খোঁড়া শুরু করেন। সেই খননের সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে বেরিয়ে আসে তাম্রযুগের বিভিন্ন নিদর্শন। প্রায় একই সময় ১৯২২-২৩ খ্রিস্টাব্দে দয়ারাম সাহানীর প্রচেষ্টায় পাঞ্জাবের পশ্চিম দিকে মন্টোগোমারি জেলার হরপ্পা নামক স্থানেও প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। জন মার্শালের নেতৃত্বে পুরাতত্ত্ব বিভাগ অনুসন্ধান চালিয়ে বহু নিদর্শন আবিষ্কার করে। নগর জীবনে ব্যবহৃত শিল্পকলা, শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জল ব্যবস্থাপনার যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে বেশ স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায়, সভ্যতাটি যথেষ্ট উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল

অনেকের দাবি, সিন্ধু সভ্যতার উত্থান ঘটেছিল আর্যদের হাত ধরেই। কিন্তু এই দাবিটি সম্ভবত সঠিক নয়। হরপ্পায় খোঁড়াখুঁড়ি করে বেশ কয়েকটি নরকঙ্কালের সন্ধান মিলেছে। সেগুলোর উপরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন, হরপ্পা নগরীর বিকাশ হওয়ার আগে থেকেই অনেক ছোট ছোট জাতি সেই অঞ্চলে বসবাস করতো। এদের মধ্য থেকে একদল এসেছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে। তাদের আবাসস্থল ছিল পশ্চিম এশিয়া। সম্ভবত তারা প্রোটো-দ্রাবিড় গোষ্ঠী ছিল। তাই, সিন্ধু সভ্যতা নির্মাণের কৃতিত্ব বহুলাংশেই অনার্য জাতিগোষ্ঠীর উপর বর্তায়। গবেষকেরা বলেছেন আর্যরা আদতে কোনো জাতি ছিল না। আর্য হলো এক ভাষাগোষ্ঠীর নাম। সকল ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাভাষীদের আর্য বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এরা বসবাস করত মূলত প্রাচীন ইরাক, ইরান, মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, গ্রিস, ইত্যাদি অঞ্চলে। এদেরই একটি অংশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিল যাদেরকে আর্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরা এসেছিল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে। মহেঞ্জাদড়োর খননকার্য থেকে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে, সিন্ধু সভ্যতা পূর্ণ পরিণতি লাভ করেছিল খ্রিষ্টপূর্ব বাইশ শতকে এবং তার ক্রমবিকাশ অব্যাহত ছিল খ্রিষ্টপূর্ব আঠারো শতক পর্যন্ত। বোঝাই যাচ্ছে হরপ্পা বা মহেঞ্জাদড়োর পত্তন বা বিকাশ কোনোটিই আর্যদের হাতে হয়নি। কঙ্কালগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেছে এগুলো মূলত, প্রোটো অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড, এবং আলপিয়ান জনগোষ্ঠীর মানুষের

প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুপরিকল্পিত নগরায়ন ঘটেছিল সিন্ধু সভ্যতায়। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো ছিল দুটি রাজধানী। যেখানে প্রাচীন শহরগুলোতে গড়ে ১০ হাজারেরও বেশি লোক বসবাস করত, সেখানে শুধু এই দুই নগরীতেই ছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার লোকের বসবাস। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা ছিল এই সভ্যতার

নগর নির্মিত হয়েছিল গ্রিড প্যাটার্নে। সড়কের শেষ সীমায় বৃত্তাকারে নির্মিত বাড়িগুলো ছিল পোড়া ইট এবং মাটির তৈরি সমতল ছাদবিশিষ্ট। প্রত্যেক বাড়ি ছিল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। কোনো কোনো বাড়ি ছিল বহুতলবিশিষ্ট। দুই কক্ষ থেকে পঁচিশ কক্ষের বাড়িও পাওয়া গিয়েছে। শহরের পয়ঃপ্রণালীও ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের। প্রত্যেক বাড়িতে বারান্দা, স্নানের জায়গা এবং কুয়া আলাদা আলাদা ছিল। বাড়ি থেকে জল নিষ্কাশনের জন্য ভূগর্ভস্থ ড্রেন ছিল। রাস্তার ড্রেনগুলোতে ছিল আধুনিককালের মতো ম্যানহোল সিস্টেম। বৃষ্টির জল সংরক্ষণের জন্যেও আলাদা আলাদা ব্যবস্থা ছিল, ছিল জলাধারও। ধারণা করা হয়, আধুনিক স্যানিটেশন ব্যবস্থা রোমানদের হাত ধরে শুরু হয়েছিল, কিন্তু রোমানদেরও প্রায় হাজার বছর পূর্বে সিন্ধুপ্রদেশের ইঞ্জিনিয়াররা পৃথিবীর প্রথম স্যানিটেশন সিস্টেমের উদ্ভাবন ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। প্রযুক্তিগত ভাবে তারা এতটাই উন্নত ছিল যে তারা নির্ভুলভাবে দৈর্ঘ্য ও ভর পরিমাপ করতে পারতো। খননের সময়ে পাওয়া গেছে অনেকগুলো কিউব আকৃতির পাথর। যা থেকে মনে করা হয়, এগুলো ভর পরিমাপের কাজে ব্যবহার করা হতো। লোথালে পাওয়া গেছে একটি হাতির দাঁতের স্কেলের ক্ষুদ্রতম মাপ ১.৬ মিলিমিটার যা ব্রোঞ্জ যুগে পাওয়া স্কেলের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র। বাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত পোড়া ইট আর্দ্রতা প্রতিরোধী এবং আকৃতিতে একই মাপের ছিল যা তাদের পরিমাপের দক্ষতার প্রমাণ দেয়। ধাতুবিদ্যা, দাঁতের চিকিৎসা, কিংবা মৃৎশিল্প - তাঁরা ছিল অনন্য পারদর্শিতার অধিকারী

কিন্তু এই সমৃদ্ধ সভ্যতাটি কিভাবে কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল তা রহস্য হয়েই থেকে গেছে। কেউ মনে করতেন আর্যদের আক্রমণ, কারও মতে ভয়াবহ বন্যা, আবার কেউ কেউ মনে করতেন প্লেগের মতো মহামারীর কারণেই ভারতের এই প্রাচীন সভ্যতার পতন ঘটেছিল, ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এই উন্নত নগর সভ্যতা

সম্প্রতি এক যুগান্তকারী গবেষণায় এই রহস্যের নির্ণায়ক সমাধান করলেন এক আন্তর্জাতিক গবেষক দল। সম্প্রতি ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তাদের গবেষণা। এই গবেষণা দলটির মতে, এই সভ্যতার পতন কোনো নাটকীয়, বিপর্যয়কর ঘটনার ফলে হয়নি। আসলে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে চলা লাগাতার খরার শিকার হয়েছিল হরপ্পা। সেই খরার কারনেই কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল সিন্ধু সভ্যতা। আইআইটি গান্ধীনগরের বিমল মিশ্র ও তাঁর সহকর্মী এবং আমেরিকার কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে ধারাবাহিক এবং তীব্র খরাই সিন্ধু সভ্যতার বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল

গবেষকেরা অত্যাধুনিক ‘প্যালিওক্লাইমেট ডেটা’ এবং কম্পিউটার মডেলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালের জলবায়ুর বিশ্লেষণ করেছেন। এই কম্পিউটার সিমুলেশন এবং তথ্য বিশ্লেষণ থেকে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন, সিন্ধু অঞ্চলে ৫,০০০ থেকে ৩,০০০ বছর আগে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ধারাবাহিক ভাবে কমতে শুরু করেছিল

গবেষকদল বলেছেন, সিন্ধু সভ্যতার জীবদ্দশায় গড়ে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১০-২০ শতাংশ হারে কমেছে এবং তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪৪৫০ থেকে ৩৪০০ বছর আগে প্রায় ৮৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চারটি বড় খরা চিহ্নিত করেছেন তাঁরা। সবচেয়ে তীব্র খরাটি ১৬৪ বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং সিন্ধু সভ্যতা অঞ্চলের ৯১ শতাংশেরও বেশি এলাকা প্রভাবিত করেছিল।

সিন্ধু সভ্যতার অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপেই সিন্ধু নদ এবং তার শাখা-প্রশাখাগুলির উপরে নির্ভরশীল ছিল। এই সভ্যতা ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক। প্রধান শস্য ছিল গম, বার্লি এবং তুলো

কিন্তু ক্রমে বৃষ্টি কমতে থাকায় এবং লাগাতার খরার কারণে সিন্ধু নদ ও তার উপনদীগুলি ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে শুরু করে। নদীনালায় জলস্তর কমে যাওয়ায় শুধু কৃষিকাজই ব্যাহত হয়নি, জলপথে বাণিজ্যও চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল

উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা এবং সুসংগঠিত নগর পরিকল্পনা সত্ত্বেও প্রকৃতির এই রূঢ়তার সামনে অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা তাঁদের কাছে খোলা ছিল না। খাবার ও পানীয় জলের অভাব নগরবাসীকে হিমালয়ের পাদদেশ ও গঙ্গা অববাহিকার দিকে সরে যেতে বাধ্য করে। ফলে, মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার মতো এক সময়ের বিশাল জনবসতিপূর্ণ শহরগুলি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং সিন্ধু সভ্যতা ক্রমে ছোট ছোট, বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ বসতিতে রূপান্তরিত হয়

তবে, গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক তথা আমেরিকার কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইড্রোলজি বিভাগের গবেষক ও অধ্যাপক, বালাজি রাজাগোপালানের মতে খরাই কিন্তু সিন্ধু সভ্যতার পতনের একমাত্র কারণ নয়। দুর্বল খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামোর মতো সামাজিক কারণগুলিও এই ধারাবাহিক খরার প্রভাবকে আরও মারাত্মক করে তুলেছিল

গবেষকরা বলেছেন, জলবায়ুগত এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল হরপ্পাবাসী। বড় শহরগুলি থেকে মানুষ ছোট গ্রামীণ বসতিতে চলে যেতে শুরু করে। খরা দিন দিন ভয়াবহ হয়ে ওঠায় নগরসভ্যতার ভেঙে পড়া অনিবার্যই ছিল। কৃষকেরা গম এবং বার্লি থেকে খরা-সহনশীল বাজরা ব্যবহার করে অভিযোজিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলি দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতার প্রভাবের ক্ষতি সম্পূর্ণরূপে পূরণ করতে পারেনি

গবেষকরা মনে করছেন, জলবায়ু, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাপের সংমিশ্রণেই সিন্ধু সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটেছিল, কোনো যুদ্ধ বা বহিরাগতদের আক্রমণ এই সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারেননি। প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুপরিকল্পিত নগরায়নের সমৃদ্ধ সভ্যতাটির হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল পরিবর্তিত জলবায়ুই

  


...............................

আ  র  ও   প  ড়ু  ন   -