akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

আবিষ্কারের কাহিনি - ৬ । বৈশাখ ১৪৩৩



এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন অন্বেষণ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই ধারাবাহিকে।


বড়শি

( খ্রি স্ট পূ র্ব  ৩৫, ০ ০ ০ )





প র্ব - ৬

মানবসভ্যতার  ইতিহাসে খাদ্যসংগ্রহের কৌশলগত উন্নয়নকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে বড়শির আবিষ্কারকে একটি ‘টেকনোলজিক্যাল ইনফ্লেকশন পয়েন্ট’ বলা চলে। সভ্যতার বিকাশে খাদ্যসংগ্রহের কৌশল ছিল অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। 

শিকার ও সংগ্রহভিত্তিক জীবনযাত্রা থেকে ধীরে ধীরে সংগঠিত খাদ্য আহরণের পথে অগ্রসর হতে গিয়ে আদিম মানুষ যে সকল সরঞ্জাম উদ্ভাবন করেছিল, তার মধ্যে বড়শি (Fish Hook) একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা যায়, প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫,০০০ থেকে ৪২,০০০ বছর আগেই মানুষ বড়শি ব্যবহার করে মাছ শিকার করতে সক্ষম হয়েছিল। এ তাদের বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন

প্রাথমিকভাবে মানুষ স্থলভাগে পশু শিকারেই অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু পরিবেশগত পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি তথা খাদ্যাভাব তাদের নতুন উৎস সন্ধানে বাধ্য করে। বিকল্প হিসেবে নদনদী, খালবিল ও সমুদ্র এক সম্ভাবনাময় খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে আবিষ্কৃত হয়। প্রথম দিকে আদিম মানব হাত চালিয়ে, পাথর ছুড়ে বা অগভীর জলে ফাঁদ পেতে মাছ ধরত। কিন্তু এর কিছু মৌলিক সমস্যাও ছিল। যেমন, কত মাছ ধরা পড়বে তা ছিল দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া এরা বড়ো মাছ ধরতে অক্ষম এবং নিয়মিত খাদ্য সরবরাহেরও কোনোরকম নিশ্চয়তা ছিল না। এই সীমাবদ্ধতা থেকেই প্রাথমিক বড়শির ধারণার জন্ম

প্রথম দিকের বড়শির গঠন ছিল অত্যন্ত সরল। আদিম মানুষ প্রকৃতির সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করেই এই সরঞ্জাম তৈরি করত। যেমন জীবজন্তুর হাড়, শক্ত ঝিনুকের খোল, পশুর শিং বা গাছের শক্ত ডালপালা। নির্মাণ উপকরণ হিসেবে হাড় শক্ত ও হালকা, তা ধারালো করা সহজ। ঝিনুকের খোল মসৃণ ও টেকসই, জলে ক্ষয় কম। পশুর শিং নমনীয় ও শক্ত, বাঁকানো আকৃতি দেওয়া সহজ। প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের ডালপালা দিয়েই বড়শি তৈরি করা হত। কাষ্ঠনির্মিত বড়শি ছিল তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও কার্যকর। সম্ভব দ্রুত নির্মাণও। আধুনিক যুগের কাছাকাছি সময়ে, বিশেষত ১৯৭০-এর দশকেও কিছু অঞ্চলে কাঠের বড়শি ব্যবহার করে জলজ প্রাণী শিকারের নজির মেলে। প্রমাণ করে যে এই প্রযুক্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর ছিল

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড়শির গঠনেও পরিবর্তন আসে। প্রথম দিকে বড়শি ছিল সোজা বা সামান্য বাঁকানো, কিন্তু পরবর্তীকালে এতে যুক্ত হয় কাঁটা (barb)এই কাঁটাযুক্ত বড়শি মাছ শিকারের ক্ষেত্রে বিপ্লব নিয়ে এল। কারণ, মাছ একবার বড়শিতে আটকে গেলে সহজে পালাতে পারত না। এতে শিকারের সফলতার হার বৃদ্ধি পেল। তাছাড়া খাদ্য সংগ্রহ আরও নিশ্চিত ও নিয়মিত হয়ে উঠল। বড়শির এই গঠনগত উন্নয়ন মানবজীবনে মাছকে এক নির্ভরযোগ্য খাদ্য উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল

বড়শির প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ক্যানবেরাস্থিত অস্ট্রেলীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নত্তত্ববিদ সুসান ওকনর ও তাঁর দলবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পূর্ব টিমরে চুনাপাথরে তৈরি জেরিমালাই নামক এক গুহায় এই ধরনের বড়শিসহ বিশালাকৃতির টুনা জাতীয় মাছের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। প্রথমে ঝিনুকের শক্ত খোলের তৈরি দুটো ভাঙা বড়শি নজরে এলেও, পরে এই গুহা থেকে ৩৮,০০০-এরও বেশি মাছের কাঁটা আবিষ্কৃত হয় এবং পরীক্ষাগারে কাঁটাগুলোর বয়স প্রায় ৪২,০০০ বছর বলে নির্ণীত হয়। এর ফলে প্রায় চল্লিশ থেকে বিয়াল্লিশ হাজার বছর আগেও আদিম মানুষ বড়শি দিয়ে মাছ শিকারে পটু ছিল বলে অনুমিত হয়। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আদিম মানুষ শুধু মাছ ধরতেই জানত না, বরং গভীর সমুদ্রে বড়োসড়ো আকারের মাছ, যেমন টুনা শিকার করতেও সক্ষম ছিল। এ তাদের নৌচালনা ও সামুদ্রিক দক্ষতারও ইঙ্গিত বহন করে

বড়শির আবিষ্কার শুধু এক শিকার-সরঞ্জামের উদ্ভাবন নয়, বরং এ মানবসভ্যতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নতিও নির্দেশ করে। যেমন, (ক) খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি: মাছ উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য। এর ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড ও অন্যান্য পুষ্টিগুণে মানুষের দৈহিক ও মস্তিষ্ক বিকাশে আমূল পরিবর্তন ঘটল। তাছাড়া বড়শির মাধ্যমে নিয়মিত মাছ আহরণ সম্ভব হওয়ায় খাদ্যসংকট অনেকাংশে কমে গেল। (খ) প্রযুক্তিগত দক্ষতা: বড়শি তৈরির জন্য প্রয়োজন উপাদান নির্বাচন, আকার নির্ধারণ ও শিকারের আচরণ সম্পর্কে জ্ঞান। এসব মানুষের বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ। (গ) পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন: নদনদী, খালবিল বা সমুদ্র—সব ধরনের জলাশয়কেই খাদ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারা মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। (ঘ) সামাজিক প্রভাব: নিয়মিত খাদ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা লাভের ফলে আদিম মানবের স্থায়ী বসতির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেল। ফলে জনসংখ্যার বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এল

আধুনিক বড়শি স্টিল বা অ্যালয় নির্মিত, রাসায়নিকভাবে শানিত বা বিভিন্ন আকার ও ডিজাইনের হলেও এর মূল নকশা কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে

বড়শি মানব ইতিহাসের এক অনন্য উদ্ভাবন, যা প্রমাণ করে যে হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ অত্যন্ত উন্নত চিন্তাশক্তি ও কারিগরি দক্ষতার অধিকারী ছিল। জেরিমালাই গুহার আবিষ্কার আমাদের দর্শায়, প্রায় ৪০,০০০ বছরেরও আগে মানুষ কেবল স্থলভাগেই নয়, জলজ পরিবেশেও নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল। অতএব, বড়শি শুধু এক সরঞ্জাম নয়, এ মানবসভ্যতার অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে। 

(চলবে)


 

সূচিপত্র

..............

আ র ও  প ড়ু ন   -

পর্ব - ১ । পাথরের যন্ত্রপাতি

পর্ব - ২ । নিয়ন্ত্রিত আগুন 

পর্ব - ৩ । আশ্রয় 

পর্ব - ৪ । পোশাক-পরিচ্ছদ


পর্ব - ৫ । বর্শা