akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

বৈজ্ঞানিকের রান্নাঘর - ১৬ । বৈশাখ ১৪৩৩



নন-স্টিকের নানা দিক











অরূপ

বন্দ্যোপাধ্যায়

এন সি আর, দিল্লি

মিনুমাসির সঙ্গে রিয়াদের ড্রয়িং রুমে আজ বসেছে জোর আড্ডা। বহুদিন পর দিদিকে কাছে পেয়ে রিয়ার মা অফিস থেকে ফিরেই উত্তেজিত। 

রিয়ার বাবাও কাজের শেষে বাড়ি ফিরে গল্পে মশগুল হয়ে গিয়েছেন মিনুমাসির বার বার চা খাওয়া অভ্যেস বলে রিয়া নিজেই চা তৈরি করে বিশাল ফ্লাস্কে ভরে রেখেছে কলকাতার চায়ের সঙ্গে দিল্লির চায়ের তফাত নিয়ে আলোচনা চলছে বড়োদের মধ্যে একটা বেলা কাটতে না কাটতে বেশ বোঝা যাচ্ছে মিনুমাসি কতখানি খুঁতখুঁতে কলকাতায় জনপ্রিয় দার্জিলিং চা দিল্লিতে বসে জোগাড় করা কতটা সমস্যার, সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছেন রিয়ার বাবা অর্ক আপনমনে মোবাইলে খুটখাট করে মেসেজ পাঠাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে রিয়ার মিনুমাসি জীবনে প্রথম বিদেশ ভ্রমণে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন, কিন্তু ইতোমধ্যেই ভারতে বাস করার নানা অসুবিধা সবার সামনে তুলে ধরতে ভুলছেন না রিয়ার বাবা পোস্ট ডক্টরেট করতে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন তাই তিনি সেই দেশে বাস করার নানা অসুবিধার কথা মিনুমাসির কাছে তুলে ধরতে গিয়ে বিফল হচ্ছেন রিয়া পড়তে বসে যাবে, নাকি বড়োদের গল্পের আসরে বসে নাকাল হবে, সেই নিয়ে ভাবছে তখনি তাদের ডোর বেল বেজে উঠল

দরজা খুলে রিয়া বিস্মিত সামনে দাঁড়িয়ে সর্দার কৃপাল সিং

কেমন সারপ্রাইজ দিলাম? এইখান দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোদের সঙ্গে একটু আলাপ করে যাই অর্ক বেটা আবার কবে যে কলকাতা পালিয়ে যায় কে জানে

খুব ভালো করেছেন, আঙ্কল! আমার বাবা-মা আপনার কথা জানেন আসুন, ভিতরে আসুনখুশিতে বিভোর হয়ে যায় রিয়া

ড্রয়িং রুমে এনে আপ্যায়ন করে বসানো হয় সর্দারজিকে অর্ক তাঁকে প্রায় জড়িয়ে ধরে আর কী!

আঙ্কল, কেমন আছেন? আপনার কথা মাঝেমধ্যেই হয়

ঝুট বোলনা কোই তুম সে সিখে ভুলেই গিয়েছিস আঙ্কলকে! কবে ফিরবি কলকাতায়?”

এই আর একটু কাজ আছে, শেষ করেই ফিরে যাব

রিয়া-মা, আমাকে কী খাওয়াবি বল?” প্রশ্ন করে হাসতে থাকেন কৃপাল সিং

রিয়া বলেছিল ওঁকে চাউমিন বানিয়ে খাওয়াবে, সেই কথা মনে করিয়ে দিয়ে নাকাল করেন রিয়াকে সে অপ্রস্তুতের হাসি হেসে জানায়, এই মুহূর্তে তা বানানো মুশকিল কিন্তু মুশকিল আসান করে দেন রিয়ার মা তিনি উঠে যাবার উদ্যোগ করে বলেন, “আমি বরং অমলেট বানিয়ে আনি সবার জন্য রিয়া, তোরা গল্প কর

কিন্তু মায়ের কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে রিয়া লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে বলে, “তুমি বসো আমি আঙ্কলকে খাওয়াব বলেছিলাম নিজের হাতে আজ অন্তত এইটুকু করে ফেলি

 

কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে ব্যাজার মুখে ফিরে আসে রিয়া সন্ত্রস্ত গলায় প্রায় ফিসফিস করে অর্ককে ডেকে সমূহ বিপদের কথা জানায় অমলেট বানাতে গিয়ে তাওয়ার ওপর সব ডিম নাকি আটকে যাচ্ছে, একটাও নিটোল করে ভাজা যাচ্ছে না চিন্তিত মুখে অর্ক উঠে চলে যায় রিয়াদের রান্নাঘরে রিয়ার কর্ম দেখে তার চক্ষুস্থির এদিকে অমলেট ঠিকমতো ভাজা না হলে অতিথিদের সামনে রিয়ার মানসম্মান বলে আর কিছুই রইবে না

তাদের দেরি দেখে রিয়ার মা এসে হাল ধরলেন— “সর্বনাশ হয়েছে এই পুরোনো ফ্রাইং প্যানে অমলেট ভেজে কোথা থেকে টেনে বার করলি ফেলে দেওয়া বাসনটা? যা, তোরা বেরো এখান থেকে আমাকে কাজ করতে দেরাগ ফুটে ওঠে রিয়ার মায়ের গলায়

মনখারাপ করে রিয়া বসার ঘরে এসে দেখে তার বাবার সঙ্গে গল্প জুড়েছেন মিনুমাসি আর সময় কাটাতে সকালের বাসি খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছেন সর্দারজি বেচারার মুখ দেখে মনে হচ্ছে অসময়ে না জানিয়ে এসে বড়ো বিব্রত হয়েছেন ভদ্রলোক জড়তা কাটানোর জন্য হাসিমুখে রিয়া সর্দারজিকে ডেকে নিয়ে যায় বাড়ির পিছন দিকের এক ফালি বাগানে

রিয়াদের বাড়ির ছোট্ট বাগানে কেয়ারি করা গোলাপ গাছের দিকে তাকিয়ে সর্দারজি বলেন, “এই যে আজকে রিয়া দিদিমণির অমলেট লেগে গেল ফ্রাইং প্যানে, এর কারণ জানিস অর্ক?”

অর্ক ইয়ার্কি করে বলে, “আমাদের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানী মনে হয় প্যানে তেল ঢালতেই ভুলে গিয়েছেন, আঙ্কল!”

মোটেই না! অতটা অজ্ঞানী আমি নই অর্কদা তোমরা কী ভাবো বলো তো আমাকে?” রাগে চেঁচিয়ে ওঠে রিয়া

রিয়ার মাথায় হাত রাখেন কৃপাল সিং— “রাগিস না মা তাহলে তোকে ফ্রাইং প্যানের ওপর যে আস্তরণ লাগানো থাকে, তার বিষয়ে জানতে হবে স্টিলের তৈরি ফ্রাইং প্যানের ওপরের তলে লাগানো হয় যে বস্তু, তাকে বলা হয় টেফলন এর বৈজ্ঞানিক নাম হলপলি-টেট্রাফ্লোরো-ইথিলন’, সংক্ষেপে পি.টি.এফ. আবিষ্কারক হলেন আমেরিকার এক বিজ্ঞানী ডক্টর প্লাঙ্কেট ইনি নিউ জার্সিতেডু পয়েন্টনামের এক গবেষণাগারে কাজ করছিলেন এয়ার কন্ডিশনার মেশিনে ঠান্ডা করার উপযুক্ত রাসায়নিক গ্যাস আবিষ্কার করার জন্য কিছু রাসায়নিক পদার্থ লোহার সিলিন্ডারে রাখা ছিল সকালে দেখা গেল, সেই রাসায়নিক পদার্থ বদলে গেছে মোমের মতো থকথকে এক পদার্থেগ্যাস কোথায়? ডক্টর প্ল্যাঙ্কেট বুঝলেন, যত নষ্টের গোড়া হচ্ছে লোহার সিলিন্ডার ওর সংস্পর্শে এসেই সিলিন্ডারে রাখা গ্যাস বদলে গেছে

ডক্টর প্লাঙ্কেটের মাথায় হাত শিব গড়তে বাঁদর গড়ে ফেলেছেন তিনি কিন্তু না, আরও পরীক্ষা করে দেখা গেল, বস্তুটি যে-কোনো ধাতুর ওপর প্রলেপ হিসাবে ব্যবহার করলে তার তল খুব মসৃণ হয়ে যাচ্ছে শুধু কী তাই? আরও গবেষণায় দেখা গেল, এই রাসায়নিক পদার্থ অনেক বেশি পরিমাণ তাপ সহ্য করতে পারে, পুড়ে যায় না সহজে এবং তলের ঘর্ষণ কমিয়ে দেয় অনেক গুণ কাজেই এয়ার কন্ডিশনারে না হোক, অন্যত্র পি.টি.এফ..-কে ব্যবহার করা যেতে পারে যাতে সাধারণ মানুষের কাছে এই বস্তুর নাম জনপ্রিয় হয়, তাই ডক্টর প্লাঙ্কেট পি.টি.এফ..- বাজারজাত নাম দিলেন টেফলন কোম্পানির মুনাফা গেল বেড়ে

টেফলনের প্রলেপ লাগানোর ফলে যেসব সূক্ষ্ম ফাঁকফোকর থাকে স্টিলের বাসনের ওপরের তলে, সেইসব বুজে গিয়ে মসৃণ এক আস্তরণ তৈরি হল, আর সহজে খাবার আটকে যেতে লাগল না

এই হল টেফলন আবিষ্কারের গল্প তবে মনে রাখতে হবে যে, আমরা যে বস্তুটি ভাজা করছি ফ্রাইং প্যানে, তাতে যথেষ্ট পরিমাণ জল থাকে যদি প্যানের তাপমাত্রা ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছে হয়, তবে জল তৎক্ষণাৎ বাষ্পে পরিণত হয়ে যায় এবং প্যান বস্তুর মাঝে সেই বাষ্প কুশনের মতো কাজ করেঅনেকটা যেন সে ভাসিয়ে দেয় ভাজা হতে থাকা বস্তুকে কিন্তু তাপমাত্রা কম হলে যে বস্তু ভাজা হচ্ছে, তা বাসনের ওপর লেগে যেতে পারে

রিয়া এতক্ষণে বুদ্ধি প্রয়োগ করে যথাযথ— “কিন্তু আঙ্কল, আমাদের ফ্রাইং প্যান তো নামি কোম্পানির, আর আমি তেল গরম করেছি অনেক তাহলে?”

দেখতে হবে প্যান কত পুরোনো স্টিলের খুন্তি বহুদিন ধরে যদি এই প্যানের ওপর ব্যবহার করা হয়, তবে খাঁজ সৃষ্টি হয় অনেক, যা খালি চোখে দেখা যায় না তাই অদৃশ্য খাঁজে আটকে যায় খাবার অমলেটের ক্ষেত্রেও তা- হয়েছে হয়তো তেলও সঠিক গরম না হতে পারেজানিয়ে দেন সর্দারজি

অর্ক খুশি হয়ে বলে, “ওহ্আঙ্কল, আপনি দেখছি বিজ্ঞানের অধ্যাপক হলেই ভালো হত আমার মনে হয় আপনার ছাত্রীটির উচিত নিয়মিত রান্নাঘরে কাজকম্ম করে নিজেকে একজন অভিজ্ঞ পাচক করে গড়ে তোলা

অর্কর উৎসাহে জল ঢেলে দেন সর্দারজি— “বিজ্ঞানের ক্লাসে এইসব পড়ালে আর সিলেবাস শেষ হবে না, দলে দলে ছাত্রছাত্রী ডাহা ফেল করবে পপুলার সায়েন্সের বইপত্র পড়লে বিস্তর জানা যায় এইসব বিষয়ে ইলেক্ট্রনিক শো-রুমে বসে বসে কত যে বই পড়ে যাই, তাই জানতে পারি তোরাও পারবি ঠিক এবার চল ভিতরে যাওয়া যাক, বোধ হয় অমলেট ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে

রিয়া সর্দারজিকে প্রশ্ন করে, “আঙ্কল, হার্ড অ্যানোডাইজড বলে যে বাসনগুলো বাজারে বিক্রি হয়, সেগুলোকেও তো নন-স্টিক বাসন বলে, তাই না? তাতেও কি টেফলন লাগানো থাকে?”

হার্ড অ্যানোডাইজড বাসনে নন-স্টিক প্রলেপ লাগানো হয় টেফলন ছাড়াই এর ইতিহাস লেখেন রাশিয়ান মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন বিশেষ এক পদ্ধতির, যা দিয়ে অত্যন্ত কঠিন এবং মসৃণ, অথচ হালকা কোনও ধাতুর আস্তরণ বানিয়ে ফেলা যায় অ্যালুমিনিয়াম ধাতু লোহার চাইতে হালকা, তাই সেই ধাতু ব্যবহার করা হল এই পদ্ধতিতে শূন্যের নীচে তাপমাত্রায় রেখে অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ইলেক্ট্রোলিসিস পদ্ধতিতে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের পাতলা চাদর বিছানো হয়…”

সর্দারজিকে থামিয়ে দিয়ে রিয়া প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, “এবার বুঝেছি! অ্যালুমিনিয়াম হল মেটাল, আর সেটা যদি ইলেক্ট্রোলিসিস পদ্ধতিতে অ্যানোডে লাগিয়ে রাখা হয়, অর্থাৎ পজিটিভ ইলেক্ট্রোডে লাগিয়ে দিই, তবে তার ওপর সহজেই জমে যাবে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড ইলেক্ট্রোলিসিস পদ্ধতিতে ধরেই ধাতুর ওপর প্রলেপ লাগানোর কায়দা বেশ পুরোনো

ঠিক বলেছিস! হার্ড অ্যানোডাইজ প্রলেপ খুবই শক্ত, সহজে ক্ষয়ে যায় না, অন্য রাসায়নিকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না হার্ড অ্যানোডাইজড বাসনের ওপর স্টিলের খুন্তি আর হাতা স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করা যায় এই বাসনের আয়ু বেশি অন্যদিকে টেফলন কিন্তু কিছু বাসন মাজার পাউডার বা লিকুইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এবং উচ্চ তাপমাত্রায় বহুদিন ব্যবহারের ফলে বিষাক্ত কেমিক্যাল তৈরি করে প্রলেপ খারাপ হয়ে চলটা উঠে যায় কিছুদিন পর স্বাস্থের কারণে এমন বাসন ব্যবহার করা একেবারেই উচিত নয় আর এক ধরনের বাসন আজকাল তৈরি হয়, যাকে বলে সেরামিক কোটেড বাসন এগুলোতে টেফলনের চাইতে বেশি তাপ সহ্য করার মতো প্রলেপ লাগানো হয় সেরামিক কোটিংয়ের ক্ষেত্রেসিলিকা জেললাগিয়ে সেই বাসনগুলো অনেক উচ্চ তাপমাত্রায় ইলেকট্রিক ফার্নেসে শুকিয়ে নেওয়া হয়

তিন ধরনের বাসনের মধ্যে কোনটা সবাচাইতে ভালো, আঙ্কল?” প্রশ্ন করে রিয়া

তিনরকমের পদ্ধতি, তিন ধরনের বাসন তিনটের মধ্যে হার্ড অ্যানোডাইজড বাসন সবচাইতে বেশিদিন টেকে কিন্তু এরও একটা অসুবিধার দিক হল, বেশি তাপ দিলে খাদ্যবস্তু বাসনে লেগে যাবার প্রবণতা দেখা যায় মাঝারি আঁচে কম তেল দিলে অনায়াসেই যে-কোনো ভাজা তৈরি করতে অসুবিধা হয় না পি.টি.এফ.. বা সেরামিক কোটেড বাসন যদি এক বা দুই বছর চলে, তো হার্ড অ্যানোডাইজড বাসন চলে তিন-চার বছর

অর্ক মজা করে বলে, “নাচতে না জানলে উঠোন, আর রাঁধতে না জানলে বাসন বাঁকাতাই তো দাঁড়াল, আঙ্কল? অমলেট লেগে যাওয়াতে রিয়ার আর দোষ কী? নিশ্চয়ই বাসনের টেফলন চটে গিয়ে চেটে খেয়েছে অমলেট!”

রিয়া এত জোরে অর্কর কোমরে চিমটি কাটে যে সে বিকট আওয়াজ করে ভিতর থেকে রিয়ার মায়ের ডাক পড়ে ওরা তিনজন এগোয় বসার ঘরের দিকে

 

(ক্রমশ)

 

সূচিপত্র

  

আরও পড়ুন  -


+ ওয়াটার ফিল্টার

+ আজকের মোটো, আজিনোমটো

 
তুলতুলে তেলেভাজা

ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল

মামলায় ঝোলে বাটার চিকেন

চার চার নয়, শক্তির হোক জয়

চিপস নয় তো চিপ

আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো

ইনডাকশন কুকারের কেরামতি

অন্ত্র তো নয় যন্ত্র

খাবারের গায়ে কেন টক টক গন্ধ

জল শুধু জল

ফ্রাই, কিন্তু ড্রাই নয়

যার নুন খাই, তার গুণ গাই

কুসুমে কুসুমে

......

পাখিদের জি পি এস

 

সূচিপত্র