'অ্যাটোকো পয়েন্ট' নামের এই পাথর
খন্ডটি মঙ্গলের অতীতে একটি উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু থাকার
সম্ভাবনাকেও জোরালো করে তুলেছে। পারসিভারেন্স রোভার জেজেরো ক্রেটারের একটি উঁচু এলাকা, 'মাউন্ট ওয়াশবার্ন' (Mount Washburn), অতিক্রম করার সময় এই উজ্জ্বল সাদা পাথরটি দেখতে পায়।
রোভারটি যখন ধুলোবালি ও অন্ধকার আগ্নেয় শিলাগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ একটি সাদা এবং দাগযুক্ত শিলা বিজ্ঞানীদের নজরে
আসে। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের একটি সাদা চুনাপাথরের পাহাড়ের নামানুসারে এর নাম রাখা
হয় 'অ্যাটোকো পয়েন্ট'।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গল গ্রহ আজকের মতো এতটা
শুষ্ক ও শীতল ছিল না। এই পাথরটি সেই সময়ের একটি সাক্ষী যখন জেজেরো ক্রেটারে বিশাল
হ্রদ এবং নদীর অস্তিত্ব ছিল।
এই সাদা পাথরখন্ডটি মূলত 'অ্যানর্থোসাইট' নামের একটি আগ্নেয়শিলা।
এটি পাইরক্সিন ও ফেল্ডস্পার সমৃদ্ধ, যা সাধারণত পৃথিবীর উচ্চভূমি বা চাঁদে দেখা যায়। মঙ্গলে এমন
শিলার উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, গ্রহটির ভূগর্ভে একসময় জটিল
ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া সক্রিয় ছিল। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এই সাদা পাথরে
কাওলিনাইট নামক অ্যালুমিনিয়াম-সমৃদ্ধ কাদা-জাতীয় খনিজ খুঁজে পাওয়া গেছে।
পৃথিবীতে কাওলিনাইট জাতীয় খনিজ তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো স্থানে কয়েক
মিলিয়ন বছর ধরে অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং উষ্ণ আবহাওয়া থাকে।
সাদা পাথরটির রাসায়নিক গঠন
বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলেছেন, এটি এমন এক পরিবেশে তৈরি
হয়েছিল যেখানে একসময়ে প্রচুর পরিমাণে জল ছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই পাথরের আবিষ্কার মঙ্গল গ্রহে কোনো এক সময়কার উষ্ণ ও গ্রীষ্মমন্ডলীয়
জলবায়ুর (Tropical
Climate) প্রমাণকে আরও শক্তিশালী করে
তুলেছে। কারণ, এই ধরণের খনিজের গঠন আর্দ্র আবহাওয়া ছাড়া সম্ভব নয়।
যেহেতু উষ্ণ জলবায়ু এবং
জলের অস্তিত্ব প্রাণের বিকাশের জন্য অপরিহার্য, তাই এই আবিষ্কার ইঙ্গিত দেয়
যে প্রাচীন মঙ্গলে একসময়ে অণুজীবের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ ছিল।
পারসিভারেন্স রোভারের এই
খোঁজ মঙ্গলের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক। এটি কেবল একটি পাথর নয়, বরং লাল গ্রহের নীল হয়ে থাকার গল্পের এক অকাট্য দলিল।
ভবিষ্যতে এই শিলার নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে মঙ্গলের জলবায়ু পরিবর্তন
সম্পর্কে আরও নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত নতুন একটি তথ্যে দেখা গেছে, জেজেরো
ক্রেটারে একসময় বড় হ্রদ এবং ঢেউয়ের ফলে তৈরি হওয়া সৈকত বা কিনারা (Ancient Shoreline) ছিল,
যা গ্রহটির প্রাচীন বাসযোগ্যতাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি
অবতরণ করার পর থেকেই পারসিভারেন্স রোভার' মঙ্গল সম্পর্কে দিয়ে চলেছে
একের পরে এক চমকপ্রদ সব তথ্য। বিগত পাঁচ বছরে এটি ৪০
কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে এবং বর্তমানে জেজেরো ক্রেটারের পশ্চিম প্রান্তে
অবস্থান করছে। রোভারটি এখন পর্যন্ত ২০টিরও বেশি শিলা ও মাটির নমুনার কোর সংগ্রহ
করেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, মঙ্গলে প্রাণের কোনো
অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে,
তাহলে সেটি এই রোভারের মাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।