akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

বৈজ্ঞানিকের রান্নাঘর - ১৭ । জ্যৈষ্ঠ - আষাঢ় ১৪৩৩



মাইক্রো-ওয়েভের মায়াবী দুনিয়া











অরূপ

বন্দ্যোপাধ্যায়

এন সি আর, দিল্লি

মিনুমাসি অস্ট্রেলিয়া যাবার ভিসা পেয়ে গেলেন। কাজ শেষ হতেই তাঁর মনে ফুর্তি এসে গেল। বিদেশে ছেলের বাড়ি যাবার আনন্দই আলাদা। মিনুমাসির সঙ্গ নিয়েছিল রিয়া আর অর্ক।

বাড়ির গাড়িটাই নিয়ে ড্রাইভার হয়েছিলেন রিয়ার বাবা অধ্যাপক সমীরণ সেন। নেহেরু প্লেসের বাজারে দিল্লির বিখ্যাত পাও ভাজি খেয়ে অর্কর মনও খুশি খুশি। এই বাজার থেকে সে সস্তায় অনেক ইলেক্ট্রনিক্স আইটেম কিনে ব্যাগবন্দি করেছে। বাড়ি ফেরার সময় চিত্তরঞ্জন পার্কে গাড়ি ঘুরিয়ে রিয়ার বাবা কিনে ফেললেন বিশাল এক ইলিশ মাছ। সেই দেখে মিনুমাসি বলে ফেললেন, “ইলিশ আবার যেমন তেমন হলে খাওয়াটা জমে না। রাত আটটা বেজে গেল প্রায়। ফ্রিজে রেখে খেলে আর সেই স্বাদ পাওয়া যাবে না। অবশ্য তোমাদের দিল্লিতে কি আর কলকাতার মতো মাছ পাওয়া যায়?”

অধ্যাপক সাফাই দেন— “কলকাতার মতো না হোক, দিল্লির মতো ইলিশ পাওয়া যায়, মিনুদি। দেখলেন তো কেমন বড়ো বাজার! আর ফ্রিজে রাখার ব্যাপারই নেই। আজ আপনার বোনের অফিস ছুটি ছিল, সে ইলিশের পোকা, দেখবেন এখনি রাঁধতে বসে যাবে।”

“এখন রাঁধতে বসে যাবে মানে? তাহলে কত রাতে খাওয়া হবে ভেবে দেখেছ?” অসন্তোষ প্রকাশ করেন মিনুমাসি।

রিয়া মায়ের পক্ষ নেয়।— “মাসি, আমার মা ইলিশ ভাপা রাঁধে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে। দেখবে কী দারুণ হবে খেতে! মাত্র কুড়ি মিনিটেই তৈরি হয়ে যাবে।”

নাক সিটকে মিনুমাসি বলেন, “এই এক মেশিন, আমার দু-চোখের বিষ। সব খাবার নষ্ট করে দেয়। আজকাল ফ্যাশন হয়েছে মাইক্রোওভেনে রান্না করার। বিজ্ঞাপনের ঠ্যালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমার বাড়িতেও আছে একখানা, পড়ে পড়ে ধুলো খাচ্ছে।”

আপত্তি জানান রিয়ার বাবা।— “ধুলো খাচ্ছে কেন? বেশ কাজের জিনিস। মাইক্রোওভেন ছাড়া আজকাল জীবন অচল বলে মনে হয়। কলকাতার লোক আপনি, এমন সেকেলে মনোভাব থাকবে কেন?”

“পাগল নাকি? বছর পাঁচেক আগে আমার বরের পেসমেকার লেগেছে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, সারাদিন রান্নাঘরে খুটখাট করেন, ওইসব মাইক্রোওভেন-টোভেন ব্যবহার করে পেসমেকার বিকল হোক আর কী!”

অর্ক প্রতিবাদ জানায়।— “মানে! পেসমেকার বিকল কেন হতে যাবে? আজকাল মাইক্রোওভেন যন্ত্রে উন্নতমানের শিল্ডিং লাগানো হয়, যা কোনোমতেই ওভেনের বাইরে আসতে পারে না, এলেও ইঞ্চি ছয়েক দূর পর্যন্ত বড়োজোর। আর আমরা কেউই মাইক্রোওয়েভ ওভেনকে নিশ্চয়ই জড়িয়ে ধরে তাকে চালাই না!”

অর্কর কথায় যে শ্লেষটুকু ছিল, তাতে মিনুমাসি পর্যুদস্ত হলেন। ভাঙবার পাত্র তিনি নন। বললেন, “চলো দেখি আজ ইলিশ মাছ কেমন রান্না হয়। আমি বাপু মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ধারেকাছে যাচ্ছি না।”

রিয়া ইলিশ খেতে ভালোবাসে। সে খুশিতে চেঁচিয়ে ওঠে, “আমি মাকে হেল্প করব। শেখাও হয়ে যাবে।”

 

বাড়ি ফিরেই রিয়া আর তার মা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ইলিশ ভাপা রাঁধতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অর্ক বসার ঘরে সোফায় বসে সদ্য কেনা কম্পিউটার হার্ড ডিস্ক লাগিয়ে ফাইল ট্রান্সফার করতে লাগল। রিয়ার বাবা বাসি খবরের কাগজ টেনে নিয়ে চোখ বোলাতে বোলাতে মিনুমাসিকে বোঝাতে লাগলেন, “বুঝলেন দিদি, মাইক্রোওভেনের অভ্যেস এখন ঘরে ঘরে। শহরাঞ্চলে এমন বাড়ি পাওয়া যাবে না, যেখানে এমন একখানা যন্ত্র নেই। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে? মাইক্রোওয়েভ ওভেনে কাপ রেখে দিয়ে বোতাম টিপে এক মিনিট ঘুরিয়ে নাও, ঠান্ডা চা একেবারে তাজা গরম। কাপের চা যদিও গরম হবে, কাপ নিজে কিন্তু গরম হয়ে যাবে না। গত শতাব্দীর অন্য অনেক আবিষ্কারের মধ্যে মাইক্রোওয়েভের আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কী ওভেন? আজ যে মোবাইল নামক যন্ত্রটি শহর গ্রাম নির্বিশেষে মানব জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তার পিছনেও আছে মাইক্রোওয়েভের অবদান।”

অর্ক রিয়ার বাবার কথা শুনতে পেয়ে বলে, “তাহলে বরং মিনুমাসি, আপনি মেসোকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেবেন না। পেসমেকার বিকল হতে পারে।”

ওদের কথার মাঝে রিয়া রান্নাঘর থেকে ফিরে এসে জানায়, “দারুণ গন্ধ বেরিয়েছে, অর্কদা! ইলিশ ভাপা রেডি। একটু পরেই আমরা খেতে বসে যাব।”

রিয়ার বাবা ওকে গুরুত্ব না দিয়ে মিনুমাসিকে বোঝান— “মাইক্রোওয়েভের আবিষ্কার কিন্তু যুদ্ধের স্বার্থে সৃষ্টি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর সমরকুশলীরা অনুভব করলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। হঠাৎ কোনও যুদ্ধজাহাজ বা হেলিকপ্টার শত্রুপক্ষের সীমানা থেকে হানা দিলে তার উপস্থিতি মুহূর্তে বুঝে না নিলে তার আঘাত থেকে বাঁচার উপায় নেই, শত্রুর আকস্মিক বোমাবর্ষণে নাজেহাল হতে হবে। তাই বিজ্ঞানীদের আদেশ দেওয়া হল, অবিলম্বে যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এক মুহূর্তে জেনে যাওয়া যায়, এমন কোনও যন্ত্র বানাও। আর যেমন আদেশ, তেমনি হল তার পালন।”

অর্ক রিয়ার বাবার কথার সূত্র ধরে বলে, “উনিশ শতকের মাঝামাঝি দূরসঞ্চারে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ ব্যবহার করা যেতে পারে, এ-কথার বৈজ্ঞানিক হদিস দিয়ে যান স্যার জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কিন্তু সে কেবলই অঙ্কের সমীকরণে। পরবর্তীকালে একটি হাই ফ্রিকোয়েন্সি ইন্ডাকশন কয়েল ব্যবহার করে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ তৈরি করে এবং একটু দূরে তাকে আর একটি কয়েলে শনাক্ত করে বিজ্ঞানী হাইনরিখ হার্জ দেখিয়ে দেন, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ সঞ্চারণে কোনও মাধ্যম লাগে না। তখনই রেডিও আবিষ্কারের সূচনা হয়ে গেল। পরবর্তী ষাট-সত্তর বছরে বিজ্ঞান দেখল রেডিও আবিষ্কার ও তার সামান্য বিবর্তন।”

অধ্যাপক অর্ককে তারিফ করে বলেন, “চমৎকার! এবার মাইক্রোওইয়েভ ওভেনের আবিষ্কারের গোড়ার কথা বলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাবার পর ১৯৪৫ সালে রাডার নিয়ে কাজ করছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পার্সি স্পেন্সার। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, রাডার (RADAR) একটি সংক্ষিপ্ত শব্দ, যার পুরোটা হচ্ছে রেডিও ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং। স্পেন্সার তখন রেডিয়ন কোম্পানির মাইনে-করা ইঞ্জিনিয়ার। রেডিয়ন সেই সময়ে আমেরিকার সবচাইতে বড়ো যুদ্ধাস্ত্র বানাবার কোম্পানি। স্পেন্সার একদিন একটি উচ্চশক্তি সম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ বিম নিয়ে কাজ করবার সময় হঠাৎই আবিষ্কার করেন, তাঁর কোটের পকেটে রেখে দেওয়া চকোলেট বার গলে গেছে। অথচ হল্যান্ডে সে-সময় বেশ শীত। স্পেন্সার মাইক্রোওয়েভের উত্তাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা অনুমান করে যন্ত্রের মধ্যে ভুট্টাদানা ছড়িয়ে দিতেই এক মুহূর্তে পপকর্ন তৈরি। এরপর আরও পরীক্ষা করে দেখার জন্য আস্ত ডিম ঢুকিয়ে দিয়ে যন্ত্র চালু করতেই ডিম ফেটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আসলে মাইক্রোওয়েভ জলের অণুগুলোকে আন্দোলিত করে উত্তাপ সৃষ্টি করে। ডিমের ভিতরের জলীয় অংশ বাষ্পে পরিণত হয়ে ডিমের খোলার ওপর চাপ সৃষ্টি করায় ডিম ফেটে চৌচির হয়ে যায়।

“এরপর স্পেন্সারের আবিষ্কারের পেটেন্ট নিয়ে ফেলল রেডিয়ন কোম্পানি। একটি বিশাল আকৃতির মাইক্রোওয়েভ ওভেন বানানো হল, যার উচ্চতা প্রায় ছয় ফুট এবং ওজন প্রায় সাড়ে তিনশো কিলো। সেই বাক্সে মাইক্রোওয়েভ পাঠিয়ে খুব কম সময়ে খাবার রান্না করে বাজারে তাক লাগিয়ে দিল রেডিয়ন কোম্পানি। কিন্তু মুশকিল হল এই যে, এধরনের ওভেন গৃহস্থের রান্নাঘরে ঢুকবে কেমন করে। কাজেই মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ক্রমশ আরও অনেক কোম্পানি মাইক্রোওয়েভ ওভেনের আকৃতি ও বানাবার খরচ কম করবার কাজে মন দিলে। ফলে রান্নাঘরে ব্যবহৃত হবার যোগ্য মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরি হয়ে গেল। ভারতেও গত দশ-পনেরো বছরে এই যন্ত্র বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

“এত গেল আবিষ্কারের কাহিনি। এবারে দেখে নেওয়া যাক মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার তৈরি হওয়ার পিছনে লুকিয়ে থাকা প্রযুক্তিগত কৌশল। মাইক্রোওয়েভ আসলে একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ, যার কম্পাঙ্ক ৩০০ মেগা হার্জ থেকে ৩০০ গিগা হার্জ পর্যন্ত হতে পারে। তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের গতিবেগ = কম্পাঙ্ক × তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কম্পাঙ্কের সঙ্গে বিপরীতক্রমে আনুপাতিক। তাই তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি, দৈর্ঘ্য তত কম। উচ্চ কম্পাঙ্কের মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গের দৈর্ঘ্য অনেক কম, ১০০ সেমি থেকে ০.১ সেমি পর্যন্ত। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোটো হওয়ায় ও কম্পাঙ্ক অনেক বেশি হওয়ায় তার শক্তি বেশি হয় এবং এই তরঙ্গ অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং প্রায় সরলরেখায় চলে। তরঙ্গের ও মাইক্রোওয়েভের এই ধর্ম কাজে লাগানো হয় দূরসঞ্চারে। যেমন মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের সংকেতকে প্রেরণ করা হয় মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে।

“এবার দেখি মাইক্রোওয়েভ তৈরি করা হয় যে যন্ত্রে, সেটা কেমন। মাইক্রোওয়েভ তৈরি হয় ম্যাগনেট্রন নামের যন্ত্রে। গহ্বর যুক্ত তামার সিলিন্ডার হচ্ছে অ্যানোড আর কেন্দ্রে বসানো থাকে ক্যাথোড। ক্যাথোডের মাঝে আছে একটি ফিলামেন্ট, যা ক্যাথোডকে গরম করে। ক্যাথোডের ওপর লাগানো থাকে বেরিয়াম অক্সাইডের পরত। ফিলামেন্টে তারের সাহায্যে বিদ্যুৎ পাঠালে ক্যাথোড গরম হয়ে ইলেকট্রন স্রোত প্রবাহিত হয়। একটি শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক এমনভাবে ম্যাগনেট্রনে বসানো থাকে, যাতে বিদ্যুৎপ্রবাহ ও চুম্বক ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে উল্লম্ব অবস্থায় কাজ করে। এই তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে প্রবেশ করে ইলেকট্রন স্ক্রুয়ের মতো প্যাঁচালো পথে অ্যানোডের দিকে ছুটে যায়। অ্যানোডের গহ্বরের সরু পথে এই উচ্চশক্তি সম্পন্ন ইলেকট্রন প্রবেশ করলে কম্পনের সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় ক্যাভিটি রেজোন্যান্স। ফলে মাইক্রোওয়েভ উৎপন্ন হয়। ম্যাগনেট্রন যন্ত্রে মাইক্রোওয়েভকে দিশা নির্দেশ করবার জন্য ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যাকে বলা হয় ওয়েভ গাইড। ওয়েভ গাইডের কাজ হল উৎপন্ন মাইক্রোওয়েভকে একটি সূক্ষ্ম পথে পরিচালিত করা।”

অধ্যাপকের বিশ্লেষণ শেষ হতে রিয়া অবাক হয়ে বলে, “বাবা, তুমি মাইক্রোওয়েভের ব্যাপারে এতসব জানলে কী করে? ম্যাগনেট্রন পড়ানো হত আমাদের বারো ক্লাসের ফিজিক্সের পাঠক্রমে।”

“যন্ত্রপাতি নিয়ে আমার যে একটু আগ্রহ আছে, তা হয়তো তুমি লক্ষ করোনি রিয়া। যে যন্ত্র আমরা ব্যবহার করি, তার বিষয়ে কিঞ্চিৎ জেনে রাখা ভালো।” রিয়াকে আশ্বস্ত করেন তার বাবা।

অর্ক এতক্ষণ বেশ মন দিয়ে মাইক্রোওয়েভের বিবরণ শুনছিল। সে তাই মন্তব্য করে, “মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ভিতরে থাকে একটি ঘূর্ণায়মান কাচের টেবিল, যার ওপর পাত্র রাখা হয়। মাইক্রোওয়েভ ওভেনের গোলাকৃতি টেবিলটা ঘোরে, যাতে পাত্রে রাখা খাদ্যবস্তু সমানভাবে গরম হতে পারে।”

রিয়ার বাবা আরও বুঝিয়ে বলেন, “আধুনিক মাইক্রোওয়েভ ওভেনে তিনটি মোড থাকে— মাইক্রো, কনভেকশন আর গ্রিল। মাইক্রো মোডে ধাতব পাত্র রাখলে চলবে না, কারণ মাইক্রোওয়েভ ধাতব পাত্রে পড়লে শর্ট-সার্কিট হয়ে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে, যা অত্যন্ত বিপদজনক। এই মোডে যন্ত্র চালাবার সময় কাচের পাত্র বা বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করা হয়। প্লাস্টিক বা কাচের অণুকে মাইক্রোওয়েভ আন্দোলিত করতে পারে না। ফলে সহজেই মাইক্রোওয়েভ পাত্র পার হয়ে চলে যায় খাদ্যবস্তুর ভিতরে। জলের অণুর ওপর মাইক্রোওয়েভের প্রভাব সবচাইতে বেশি। প্রায় সব খাবারেই জল থাকে, তাই পাত্রে রাখা খাদ্য দু-এক মিনিটেই গরম হয়ে গেলেও কাচের পাত্র গরম হয় না।

“কনভেকশন ও গ্রিল মোডে ম্যাগনেট্রন বন্ধ থাকে, একটি বিশেষ ইলেকট্রিক্যাল হিটার চালু হয়ে ওভেনে উত্তাপ সৃষ্টি করে। সেই উত্তাপকে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আপনা থেকেই চালু হয় একটি ফ্যান। গ্রিল মোডে উচ্চ তাপে ইলেকট্রিক্যাল হিটার খাদ্যকে গ্রিল করতে বা সেঁকে নিতে সাহায্য করে। কনভেকশন এবং গ্রিল মোডে ম্যাগনেট্রন বন্ধ থাকায় মাইক্রোওয়েভ তৈরি হয় না। কাজেই এই দুই মোডে ওভেন চালাবার সময় ধাতব পাত্র রাখলে অসুবিধা নেই। কেক তৈরি করতে কনভেকশন মোড ব্যবহার হয়।”

“কিন্তু বাবা, ফ্রিজ থেকে বার করা খাবার সহজে গরম হয় না কেন? বেশ কয়েক মিনিট মেশিন চালালেও নীচের দিকের খাবার ঠান্ডাই থেকে যায়, তাই না?”

“এর কারণ হল মাইক্রোওয়েভ বড়োজোর কয়েক ইঞ্চি যেতে না যেতেই তার শক্তি হারিয়ে ফেলে। তাই খাবার গরম করার সময়ে দুই থেকে তিন মিনিট গরম করে, পাত্রের খাবার একটু নেড়েচেড়ে নিয়ে আবার গরম করে নাও, কোনও অসুবিধা নেই।”

অর্ক এবার মিনুমাসির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে বসে, “প্রায়শই আমরা শুনে থাকি মাইক্রোওয়েভ ওভেনের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন চুম্বক শক্তি মানব শরীরে ক্ষতি করতে পারে। এটা একেবারেই সত্য নয়। ম্যাগনেটিক-শিল্ড বা চুম্বকীয় ঢাল ওভেনের চারদিকে থাকার ফলে ওভেনের চুম্বক ক্ষেত্র বাইরে আসতে পারে না এবং এর থেকে উদ্ভূত মাইক্রোওয়েভও বাইরে আসতে পারে না। মাইক্রোওয়েভে রান্নার নানা পদ্ধতিও সাধারণত ওভেন কেনবার সময় অনেক কোম্পানি দিয়ে থাকে। এই সমস্ত তথ্য পড়ে নিলে সুস্বাদু রান্নায় ভুরিভোজ করা সম্ভব। আর রিয়া, এই যে তুই বললি মাইক্রোওয়েভে ফ্রিজে তুলে রাখা বাসি খাবার গরম করে খাবার কথা, এই প্রসঙ্গে বলি, কড়াইতে ঢেলে বাসি খাবার গরম করলে বেশি তাপে খাদ্যগুণ এবং তার স্বাদ নষ্ট হতে পারে, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে তা হয় না।”

রিয়ার মা বসার ঘরে এসে বলেন, “খাবার দেওয়া হয়েছে টেবিলে। এবার সবাই মিলে বসে পড়া যাক। মিনুদির বেশি রাত জাগার অভ্যেস নেই। তবে দিদি, অস্ট্রেলিয়া গিয়ে কিন্তু মাইক্রোওয়েভ ওভেন ছাড়া তোমার গতি নেই, মনে রেখো।”

মিনুমাসি কষ্টের হাসি হেসে উঠে যেতে যেতে বলেন, “আগে গিয়ে পৌঁছই, তারপর কোন ওভেনে রান্না হবে দেখা যাবে।”

  

(ক্রমশ)

 

সূচিপত্র

  

আরও পড়ুন  -


+ নন-স্টিকের নানা দিক


+ ওয়াটার ফিল্টার


+ আজকের মোটো, আজিনোমটো

 
+ তুলতুলে তেলেভাজা

+ ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল

+ মামলায় ঝোলে বাটার চিকেন

+ চার চার নয়, শক্তির হোক জয়

+ চিপস নয় তো চিপ

+ আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো

+ ইনডাকশন কুকারের কেরামতি

+ অন্ত্র তো নয় যন্ত্র

+ খাবারের গায়ে কেন টক টক গন্ধ

+ জল শুধু জল

+ ফ্রাই, কিন্তু ড্রাই নয়

+ যার নুন খাই, তার গুণ গাই

+ কুসুমে কুসুমে

......

+ পাখিদের জি পি এস

 

সূচিপত্র