জ্ঞান বিজ্ঞান । অগ্রহায়ণ ১৪৩২

গাছের ভাষা   












ড. সৌমিত্র চৌধুরী

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ




 

গাছ তো মূক, বোবা।
শব্দ করতে পারে না।
তার আবার ভাষা কী?

খুব ভারী প্রশ্ন।ভাষার সংজ্ঞা ধরেই টানতে হয়। ভাষা বলতে আমরা বুঝি, মানুষের বাকযন্ত্র (গলনালি, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দন্ত, নাসিকা ইত্যাদির সমন্বয়) থেকে উৎপন্ন এবং ভাবপ্রকাশে সক্ষম অর্থবোধক ধ্বনি।সহজ অর্থে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমই ভাষা। মনের ভাব ব্যক্ত করতে যা ব্যবহার করি, তা-ই ভাষা। 

বাকযন্ত্র ছাড়া কি ভাষা হয় না? হয় বই-কি। অঙ্গ-সঞ্চালন শব্দ আলো বিদ্যুৎ লেখনি ইত্যাদি কাজে লাগিয়েও অন্যকে বার্তা দিতে পারি। এই বার্তাই ভাষা। কিন্তু ভাষা কি শুধু আমাদেরই আছে? অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষই কি একমাত্র প্রাণী যারা ভাষার ব্যবহার জানে

নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রাণীকুলের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এর নাম, ক্রস টক। একটি কোষ সংলগ্ন কোষের সঙ্গে ক্রস টক করে।  

কীটপতঙ্গ মাছ পশুপাখি, এমনকি গাছও একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারে না, নাসিকা কণ্ঠ জিহ্বা বিহীন প্রাণীও ভাব বিনিময় করে। কমিউনিকেশনের মাধ্যম কখনও শব্দহীন চলন, অঙ্গের কোথাও কোনো পরিবর্তন, রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ কিংবা বিদ্যুৎ সিগন্যালের ব্যবহার। 

গাছের ভাষার প্রতি হালের বিজ্ঞানীকূলের অদম্য কৌতূহল। আধুনিক গবেষণা জানান দিয়েছে, নিজেদের মধ্যে বিশেষ উপায়ে ভাব বিনিময় করতে পারে বৃক্ষকুল।অন্ধ ভূমিগর্ভ হতেসূর্যের আহ্বান শোনা বৃক্ষ তো মূক, বধির। তেমনই ধারনা ছিল আমাদের। কিন্তু ইদানীং অবগত হয়েছি একটি বিষয়ে। ‘…বৃক্ষ, আদিপ্রাণব্যথা বেদনা ব্যক্ত করতে পারে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সিগন্যাল কিংবা গন্ধযুক্ত কিছু রাসায়নিক পদার্থ। 

ঘ্রাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যপারটা দ্বিপদ তথা চতুষ্পদ প্রাণীকুলে যথেষ্টই পরিচিত। বাঘ ঘ্রাণ (ফেরোমন) ছড়িয়ে নিজের এলাকা চিহ্নিত করে। উদ্ভিদকুল উৎকট রাসায়নিক তৈরি করে, তার ঘ্রাণ ছড়িয়ে শত্রুকে দূরে পাঠিয়ে দিতে পারে। এই প্রসঙ্গে উদাহরণ দেওয়া যাবে। তার আগে আরেকটি বিষয়। 

   কী ধরণের রাসায়নিক-নির্ভর উদ্ভিদের যোগাযোগ ব্যবস্থা? একাধিক উদ্বায়ী জৈবযৌগ ব্যবহার করে গাছ। মানে, ভোলাটাইল অরগ্যানিক কম্পাউন্‌ডস (VOCs) ব্যবহার করে সংকেত পাঠায়। মূলত চার ধরণের রাসায়নিক। ফ্যাটি অ্যাসিড, বেঞ্জিনয়েড, অ্যামিনো অ্যাসিড আর টারপিনয়েডস।  

রাসায়নিক উপাদান কাজে লাগিয়ে গাছের আত্মরক্ষার বহু উদাহরণ হাজির করা যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার সাফারি পার্কের ঘটনা। অ্যাকেশিয়া গাছের পাতা খাচ্ছিল জিরাফ। উঁচু গাছ অ্যাকেশিয়া, তার পাতা জিরাফের পছন্দ। কিন্তু পাতা ভক্ষণ চলছিল নির্দয় ভাবে। পাতা হারিয়ে ফেললে গাছের প্রাণ সংশয়। জিরাফ গুলোকে দূরে পাঠাতে হবে। কী করল গাছ? পাতার মধ্যে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে ফেলল। ট্যানিন নামের যৌগ তো পাতায় ছিলই, তার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে পাতার স্বাদে তিক্ত ভাব বাড়িয়ে দিল। আর বাতাসে ছড়াতে থাকল ইথিলিন। বিষাক্ত ইথিলেন গ্যাসের সংকেত পেয়ে অন্য অ্যাকাশিয়া গাছও তাদের পাতায় দ্রুত বাড়িয়ে ফেলল ট্যানিনের পরিমান

উদ্ভিদের কাজকর্ম চলে ধীর গতিতে। তবে কখনও বেশ দ্রুতও করে ফেলে। যৌগিক পদার্থ তৈরি করে কিছু সময়ের জন্য বৃক্ষকুল নিজেদের রক্ষা করতে পারে। বহু পোকামাকড়ের আক্রমণ সইতে হয় গাছকে। কীটপতঙ্গের দেহরসের বৈশিষ্ঠ বুঝে নিয়ে গাছ কিছু রাসায়নিক তৈরি করে নিজেদের রক্ষা করে। অনেক সময় রাসায়নিক যৌগ ছড়িয়ে উপকারী প্রাণীকেও কাছে ডেকে নেয়।  

রাসায়নিক নিঃসরণ ছাড়াও বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে পারে উদ্ভিদকুল। কোথাও আঘাত লাগলে বা কুড়ুলের কোপ পড়লে গাছের টিসু ইলেকট্রিক ইম্পালস পাঠায়। বৃক্ষের কোনো অংশে বিপদ ঘটলে অন্য জায়গায় তার খবর পৌঁছে যায়। বিপদের খবর পেয়ে বৃক্ষপত্র বিশেষ ধরণের রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে নেয়। অর্থাৎ নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও খানিক তৈরি করে নিতে পারে গাছপালা। কোনো কোনো গাছের পাতায় বিষাক্ত, অতি তিতো কষ মজুদ থাকে। পাতা খেতে আসা পোকাদের মেরে ফেলতে পারে এই রাসায়নিক। নিম পাতার কথা মনে পড়ে।  অনেক গাছের পাতায় কাণ্ডে মজুত থাকে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড (মানুষের কাজে লাগে)। এই রাসায়নিকের উপস্থিতি পতঙ্গ আক্রমণ থেকে রক্ষা করে বৃক্ষকে। 

শুধু পাতার রাসায়নিক নয়। শেকড়ের মধ্য দিয়েও বিপদসংকেত পাঠায় গাছ। শেকড়ের ডগায় লেগে থাকে ছত্রাক। ছত্রাক, উদ্ভিদ কোষের সমগোত্রীয় নয়। মাটিতে মিশে থাকে। মাটির ভিতর উদ্ভিদমূলে যুক্ত হয়ে থাকে ছত্রাকের নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে এক গাছ আরেক জনের কাছে বিপদ সংকেত পাঠিয়ে দেয়। বিপদসংকেত অন্য গাছে পৌঁছে যাবার পর সেই গাছও   বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি এবং সেটির নিঃসরণ শুরু করে দেয়। 

গাছের শেকড় মাটির গভীরে অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে থাকে। এর মধ্য দিয়ে ছত্রাকের সাহায্য নিয়ে, গাছেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে। আধুনিক গবেষণা আরও জানিয়েছে, কোনো গাছ দুর্বল হয়ে গেলে তার আত্মরক্ষার ক্ষমতা, যোগাযোগের দক্ষতা কমে যায়। আর পোকামাকড়ের দল বেছে বেছে তাদের উপরেই আক্রমণ হানে। 

গাছের ভাষা নিয়ে বিরামহীন গবেষণা চলছে। নতুন তথ্য উঠে আসছে প্রায় রোজই। প্রশ্ন উঠছে, ‘মূকবিশেষণটি বৃক্ষের ক্ষেত্রে আর ব্যবহার করা যাবে কি?

আগে ভাবা হত উদ্ভিদ জগৎ স্থির, বধির, মূক। এখনকার ধারণা অন্যরকম। জানতে পেরেছি, বৃক্ষকুল গতিশীল। যদিও তারা শব্দের মাধ্যমে কথা বলে না কিন্তু বার্তা পাঠায় ভিন্ন উপায়ে। রসায়নিক পদার্থ, বিদ্যুৎ এবং ছত্রাক ব্যবহার করে। বার্তা পাঠিয়ে নিজে বাঁচে। প্রতিবেশীদের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়।গাছের ভাষানিয়ে গবেষণা চলছে বিস্তর। অচিরেই সবুজ বৃক্ষরাজির বহু গোপন রহস্য উন্মোচিত হবে



আরও পড়ুন  -

 

+ জোনাকি জ্বলে মিটিমিটি

খুব ছোট ক্ষমতায় সূর্যেরও বেশী


গলগি


বোতল ব্রাশ


ফুলের কেন এত রঙ

ডাকটিকিটে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ...

প্রকৃতির ফাঁদ

বিজ্ঞান দিবস ও ভারতের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

হাড়গিলা কি বিলুপ্ত পাখি

মাইক্রোবায়োলজি আর মাইক্রোস্কোপ

রহস্যে মোরা গিরগিটি

হাঁস নিয়ে অন্য কথা