আদপেই নয়। রাসায়নিক গঠন বিচারে টক্সিন এক ধরনের প্রোটিন।
জীবাণুর মধ্যে, জীবজন্তু প্রাণীর শরীরে পাওয়া যায়। অনেক প্রাণী
আবার টক্সিন কাজে লাগিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখে। কিছু টক্সিন তেমন বিষাক্ত নয়।
আবার অনেক প্রাণীর দেহের টক্সিন মারাত্মক বিষ। তেমনই এক প্রাণী সোনালি বিষাক্ত
ব্যাং (golden poison frog)।
তেমন বড় আকারের প্রাণী নয়, মাত্র দু ইঞ্চি লম্বা। তবে রঙের বিশেষত্বের জন্য প্রাণীটি
চোখে পড়ে। আর এরা বেঁচে থাকে ছয় থেকে দশ বছর অবধি। ভয়ঙ্কর রকমের বিষাক্ত এই
প্রাণী। বৈজ্ঞানিক নাম ফাইলোবেটস টেরিবিলিস (Phyllobates terribilis)। ব্যাঙের এই
প্রজাতি ‘ভয়ানক’ (Terrible) বলে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ এর শরীরের ত্বকে থাকে প্রাণঘাতী
বিষ, বিশেষ ধরনের টক্সিন। তার নাম ব্যাটরাকো টক্সিন (batrachotoxin)। অত্যন্ত
বিষাক্ত, স্নায়ু ধ্বংসকারি (Neuro toxic)। বিজ্ঞানের
পরিভাষায় এক ধরনের অ্যালকালয়েড। ব্যাঙের চামড়ার সব জায়গায় ছড়িয়ে থাকে এই
অ্যালকালয়েড-বিষ।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে নেওয়া উচিৎ। অ্যালকালয়েড প্রকৃতি
থেকে পাওয়া এক ধরণের রাসায়নিক যৌগ, যার মধ্যে নাইট্রোজেন পরমাণু থাকবেই। বেশীর ভাগ অ্যালকালয়েড যেমন নিকোটিন, ক্যাফিন, মরফিন পাওয়া
যায় উদ্ভিদ থেকে। আবার ফাঙ্গাস, ব্যাকটেরিয়া, অল্প কিছু প্রাণী থেকেও পাওয়া যায় অ্যালকালয়েড।
তেমনই এক প্রাণী সোনালি বিষাক্ত ব্যাঙ। সেই ব্যাঙ স্পর্শ করলেই বিষাক্ত টক্সিনের ক্রিয়ায় মৃত্যু
ঘটবে মানুষ বা অন্য জন্তুর। শরীরে শুরু হবে কাপুনি, পেশী বিকল হয়ে পড়বে। হৃদপিণ্ড, শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ। মানে অনিবার্য মৃত্যু। কোনো
চিকিৎসা নেই এর বিষক্রিয়া থেকে বাঁচবার।
সাঙ্ঘাতিক এই বিষকে ব্যবহার করে মানুষ। বিষটি কাজে লাগিয়ে
শিকার করে। টক্সিন মাখানো বিষ বড় প্রাণীর দিকে ছূড়ে দিলেই সেটির অবধারিত মৃত্যু।
কেমন করে সংগ্রহ করে এই বিষ? পরে বলবো সে কথা। বিশেষ প্রজাতির এই ব্যাং-এর দর্শন মেলে
দক্ষিণ আমেরিকার কলোম্বিয়ায়। বিশেষ করে অরণ্যের ঘন-বর্ষণ (Rain forest) অঞ্চলে। জঙ্গলের পোকামাকড় ধরে খায় এই ব্যাং। মানব বসতি
বৃদ্ধির কারণে হ্রাস পাচ্ছে রেইন ফরেস্ট। ফলত সংখ্যায় কমে আসছে হলুদ বিষাক্ত
ব্যাঙের এই প্রজাতি। প্রকৃতি
সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার (The International Union for Conservation
of Nature, IUCN) তালিকায় বিপন্ন প্রজাতি
হিসাবে এই ব্যাঙ চিহ্নিত। সমগ্র প্রজাতিটি বিলুপ্তর মুখে দাঁড়িয়ে।
কলোম্বিয়ার অরণ্য অঞ্চলে অনেক ধরনের উপজাতির বাস। উপজাতি
মানুষেরা ব্যাঙকে বল্লম বা বর্শায় গেঁথে নেয়। তারপর ছোট পাত্রে পুড়িয়ে দেয়। পোড়া
অংশেই থাকে বিষ। তীরের ফলায় সেই বিষ মাখিয়ে তৈরি করে বিষাক্ত অস্ত্র। সেই অস্ত্র
ব্যবহার করে জীবজন্তু শিকার করে। রসায়নাগারে স্পর্শ বাঁচিয়ে বিষ সংগ্রহ করা হয় অতি
সাবধানে।
খুব ছোট্ট আকারের প্রাণী এই ব্যাঙ। বলা হয়েছে, লম্বায় দু-আড়াই ইঞ্চি। শরীরের পেছন দিকের ঘাড়ের কাছে
গ্ল্যান্ড থেকে ক্ষরণ হয় বিষাক্ত টক্সিনটির। বিষাক্ত এই রাসায়নিক নিয়ে গবেষণা
হয়েছে বিস্তর। তীব্র ব্যথার উপশমে ব্যবহার হয় মরফিন। মরফিনের চাইতেও বেশি কার্যকরী
ব্যাং থেকে পাওয়া ব্যাটরাকো টক্সিন। এর রাসায়নিক গঠনে
সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে ওষুধও তৈরি হয়েছে। নাম এপিবেটাডিন (Epibetadine)। তবে অতি
বিষাক্ত বলে ব্যবহার হয় খুব কম।
চিকিৎসা গবেষণায় এও দেখা হচ্ছে যে এই বিষগুলোকে পেশি
শিথিলকারী, অবেদনকারী (অ্যানেস্থেটিক) এবং হৃদ্উত্তেজক
ওষুধে রূপান্তর করা যায় কি না। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো মরফিনের চেয়েও উন্নত অবেদনকারী হিসেবে ব্যবহৃত হতে
পারে।
আমাদের দেশের বিশাল জীব বৈচিত্রে রয়েছে অনেক ধরনের ব্যাং। কিন্তু দেখা মেলে না ফাইলোবেটস টেরিবিলিস। এই ব্যাং কেন, আজ অবধি ভারতবর্ষের কোথাও বিষাক্ত ব্যাঙের সন্ধান মেলেনি।