akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

আবিষ্কারের কাহিনি - ৭ । জ্যৈষ্ঠ - আষাঢ় ১৪৩৩





এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন অন্বেষণ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই ধারাবাহিকে।


হিসাবরক্ষক লাঠি



( খ্রি স্ট পূ র্ব  ৩৫, ০ ০ ০ )





প র্ব - ৭

আধুনিক ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার কিংবা জটিল গাণিতিক সূত্রের বহু সহস্র বছর আগে, আদিম মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রয়োজন মেটাতে যে প্রাথমিক গণনাপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল, তারই এক প্রাচীন নিদর্শন হল ‘হিসাবরক্ষক লাঠি’ বা ট্যালি স্টিক। 

এই সামান্য খাঁজকাটা হাড় বা কাঠির মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানব মস্তিষ্কের প্রাথমিক গণনাশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং সময়-পরিমাপের সূক্ষ্ম বোধের এক অনন্য সাক্ষ্য

১৯৬০ সালে আফ্রিকার বেলজিয়ান কঙ্গো অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এক আশ্চর্য আবিষ্কার করেন—একটি বেবুনের ঊরুর হাড়, যার গায়ে খোদাই করা অসংখ্য দাগ। এলোমেলো নয়, বরং তিনটি সমান্তরাল রেখার ওপর আড়াআড়িভাবে সুসংগঠিতভাবে কাটা। এই বিন্যাস থেকেই গবেষকরা ধারণা করেন, এ কেবল অলংকরণ নয়, বরং নির্দিষ্ট এক উদ্দেশ্যপূর্ণ গণনাপদ্ধতির অংশ

এর কিছুদিন পর, লেবম্বো পর্বতমালা অঞ্চলে আরও একটি অনুরূপ হাড় আবিষ্কৃত হয়, যা পরবর্তীকালেলেবম্বো হাড়নামে পরিচিত হয়। এই হাড়ে মোট ২৯টি সুস্পষ্ট খাঁজ পাওয়া যায়। রেডিও-কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখা যায়, এই নিদর্শনের বয়স প্রায় ৩৫,০০০ বছর—অর্থাৎ, খ্রিস্টপূর্ব ৩৫,০০০ সালের কাছাকাছি সময়ের। এই সময়কাল মানবসভ্যতার প্রস্তর যুগের অন্তর্গত, মানুষ যখন কৃষিকাজ শুরু করেনি, বরং শিকার ও সংগ্রহের ওপরই নির্ভরশীল ছিল

এই ২৯টি খাঁজ কিন্তু বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক গবেষক মনে করেন, এই জিনিস সম্ভবত চান্দ্রমাসের দিনসংখ্যা নির্দেশ করে। চাঁদের এক পূর্ণ আবর্তন বা লুনার সাইকেল প্রায় ২৯.৫ দিন স্থায়ী হয়। ফলে ধারণা করা হয়, আদিম মানুষ এই ধরনের ট্যালি স্টিক ব্যবহার করে চাঁদের দশা বা চান্দ্রকলার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও গণনা করত। এটি প্রমাণ করে যে, তারা শুধু সংখ্যাগণনা করতেই সক্ষম ছিল না, বরং প্রকৃতির চক্র—বিশেষ করে আকাশীয় গতিবিধি সম্পর্কেও সচেতন ছিল

তবে এই আবিষ্কারই একমাত্র নয়। এর আগেই, ১৯৩৭ সালে বর্তমান চেকস্লোভাকিয়া অঞ্চলে খননকার্যের সময় প্রত্নতাত্ত্বিক কার্ল অ্যাবসোলন এক নেকড়ের হাড় আবিষ্কার করেন, যা ট্যালি স্টিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই হাড়ে মোট ৫৫টি খাঁজ ছিল। অনেক গবেষক এই দাগগুলোকে ট্যালি মার্কস বা গণনার চিহ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই নিদর্শনের বয়সও প্রায় ৩০,০০০ বছর বলে নির্ধারিত হয়েছে

এইসব আবিষ্কার একত্রে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এক সত্য তুলে ধরে—মানবজাতি খুব প্রাচীনকাল থেকেই সংখ্যার ধারণা ও গণনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল। শিকার করা পশুর সংখ্যা, খাদ্য মজুতের পরিমাণ, কিংবা ঋতুচক্রের হিসাব রাখার জন্যই সম্ভবত এই ধরনের ট্যালি স্টিক ব্যবহৃত হত। এগুলো ছিল আদিম হিসাবরক্ষণের হাতিয়ার, যা ধীরে ধীরে আরও জটিল গাণিতিক পদ্ধতির দিকে মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়

আরও এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই ট্যালি স্টিকগুলো মানুষের বিমূর্ত চিন্তাশক্তির প্রমাণ বহন করে। একটি দাগ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে নির্দেশ করছে—এই ধারণা আসলে প্রতীকী চিন্তাশক্তিরই সূচনা। এই প্রতীকী চিন্তাভাবনাই পরবর্তীকালে সংখ্যা পদ্ধতি, লিপি এবং গণিতের ভিত্তি গড়ে তোলে

সুতরাং, হিসাবরক্ষক লাঠি বা ট্যালি স্টিক কেবল এক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, এ মানব মেধার বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, কীভাবে আদিম মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ধীরে ধীরে জ্ঞান ও প্রযুক্তির পথে অগ্রসর হয়েছে। আজকের উন্নত গণিত ও প্রযুক্তির পেছনে যে দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তার সূচনা হয়েছিল এই সাধারণ খাঁজকাটা হাড়ের মধ্য দিয়েই। 

(চলবে)


 

সূচিপত্র

..............

আ র ও  প ড়ু ন   -

পর্ব - ১ । পাথরের যন্ত্রপাতি

পর্ব - ২ । নিয়ন্ত্রিত আগুন 

পর্ব - ৩ । আশ্রয় 

পর্ব - ৪ । পোশাক-পরিচ্ছদ


পর্ব - ৫ । বর্শা


পর্ব - ৬ । বড়শি