তাদের চারটি পা ছিল, কিন্তু সময়ের
সাথে সাথে, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাদের শরীরে যে পরিবর্তন
আসে তাতেই একদিন তাদের পা হারিয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারনা বিবর্তনের ধারায় মাটির
নিচে গর্ত করে থাকা বা সাঁতার কাটার সুবিধার্থেই তারা ধীরে ধীরে পা হারিয়ে
ফেলেছিল। মাটির নিচে চলাচলের জন্য পা থাকার চেয়ে তাদের লম্বা নমনীয় শরীর বেশি
প্রয়োজন ছিল।
কয়েক বছর আগে আর্জেন্টিনার
রিও নেগ্রো প্রদেশের প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের 'ক্যান্ডেলেরোস
ফর্মেশন' -এ প্যালেওন্টোলজিস্ট ড. সেবাস্তিয়ান আপেস্তেগুইয়া এবং তার
দল গবেষনা করতে গিয়ে কয়েকটি অচেনা প্রাণীর জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছিলেন। অনুমান, জীবাশ্মটি ছিল দশ কোটি বছর আগের, ক্রিটেসিয়াস
যুগের। জীবাশ্মগুলি সংরক্ষণের জন্য তারা বুয়েনস আইরেসে অবস্থিত সেই দেশের সরকারি
জাদুঘর ও গবেষণা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ।
২০০৬ সালে বিজ্ঞানী সেবাস্টিয়ান আপেস্তেগুইয়া এবং
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হারপেটোলজিস্ট (সরীসৃপ বিশেষজ্ঞ) হুসাম
জাহের যৌথভাবে সেই সংরক্ষিত জীবাশ্মের একটিকে আদিম যুগের সাপ নাজাশ
রিওনেগ্রিনা (Najash
rionegrina)-এর জীবাশ্ম হিসেবে শনাক্ত করেন। বিজ্ঞানীরা বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য দেখে
নিশ্চিত হয়েছিলেন যে এটি কোনো সাধারণ লিজার্ড বা অন্য সরীসৃপ নয়, বরং এটি একটি
আদিম সাপ।এর মাথায় আধুনিক সাপেদের মতো বিশেষ কিছু অস্থিসন্ধি ছিল যা বড়
শিকার গিলে খাওয়ার জন্য প্রয়োজন হয়। এই সাপটির ছিল ছোট কিন্তু স্পষ্ট পেছনের পা,
আর খুলিতে ছিল ‘জুগাল’ বা গালের হাড়—যা আধুনিক সাপদের মধ্যে নেই। অধিকাংশ
আদিম সাপের জীবাশ্মে পায়ের হাড় অসম্পূর্ণ থাকলেও, নাজাশ
রিওনেগ্রিনার পা ছিল বেশ শক্তিশালী এবং সুগঠিত। এই পাগুলো একটি হাড়ের কাঠামোর (sacrum)
মাধ্যমে মেরুদণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল, যা প্রমাণ করে যে এরা দীর্ঘ সময় ধরে পা ব্যবহার
করতে পারত।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সাপের পূর্বপুরুষেরা গর্তে বাস করত বা মাটির
নিচে চলাচল করত। ফলে একসময়ে তাদের শরীর দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি পা ছোট হতে
শুরু করে এবং অবশেষে অকার্যকর হয়ে পড়ে। আগে ধারণা করা হতো, সাপের
পূর্বপুরুষ ছিল ছোট আকারের মাটির নিচে বসবাসকারী প্রাণী। কিন্তু নাজাশ
রিওনেগ্রিনার বিশালাকৃতির দেহ এবং বড় মুখের গঠন সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড়
করিয়ে দিয়েছে। নাজাশ রিওনেগ্রিনা মরুভূমিতে বসবাসকারী একটি স্থলচর প্রাণী ছিল।
এর মাথার গঠন দেখে বোঝা যায় যে এরা আধুনিক সাপের মতো বড় শিকার ধরতে এবং মুখ অনেক
বড় করে খুলতে সক্ষম ছিল। সাপটির নামকরণ করা হয়েছে বাইবেলের পৌরাণিক সাপ 'নাহাশ'
(Nahash)-এর নামানুসারে, যার পা ছিল বলে মনে করা হয়।
গবেষকেরা
বলেছেন প্রাচীন সাপেরা ছিল সক্রিয় শিকারি, তারা স্থলভাগে
ঘুরে বেড়াত। গবেষকেরা মাইক্রো-সিটি স্ক্যান ব্যবহার করে জীবাশ্মের ভেতরের সূক্ষ্ম
গঠন বিশ্লেষণ করেছেন, যা সাপের খুলির বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি দূর
করেছে। ২০১৩ সালে আপেস্তেগুইয়ার সহযোগী গবেষক ফার্নান্দো গারবারোগ্লিও, নাজাশ
রিওনেগ্রিনার একটি অত্যন্ত সুসংরক্ষিত ত্রিমাত্রিক (3D) খুলি খুঁজে পান
যেটি ২০১৯ সালে প্রকাশিত গবেষণায় সাপের বিবর্তন বুঝতে আরও বেশি সাহায্য করে।
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে সাপের বিবর্তন সরল ছিল না,
বরং ধাপে ধাপে তারা শরীরের গঠন বদলেছে। আসলে, সাপের বিবর্তন
ছিল একটি দীর্ঘ, জটিল এবং বিস্ময়কর প্রক্রিয়া। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন,
প্রায় ১৭ থেকে ২০ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে এদের বিবর্তন শুরু হয়েছিল। সেই
সময়েই নাজাশ রিওনেগ্রিনা বা টেট্রাপোডোফিসের মতো সাপেদের বিবর্তন ঘটে, যাদের
পা ছিল। কিছু আধুনিক সাপের দেহে যেমন বোয়া এবং অজগর সাপের দেহে এখনও ছোট পায়ের
অবশেষ (পেলভিক স্পার) দেখা যায়, যা আজও তাদের পূর্বপুরুষদের পায়ের স্মৃতিই বহন করে চলেছে।
নাজাশ রিওনেগ্রিনা শুধু একটি প্রাচীন সাপ নয়—এটি এমন একটি
‘ট্রানজিশনাল ফসিল’, যা দেখায় কীভাবে ধাপে ধাপে আধুনিক সাপের শরীরের গঠন তৈরি
হয়েছে।প্রায় ৬.৫ কোটি বছর আগে ডাইনোসদের বিলুপ্তির পরে আধুনিক বিষধর ও বিশাল
আকৃতির সাপেদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তবে, ব্রাজিলে
পাওয়া Boipeba tayasuensis নামের এক প্রাচীন অন্ধ সাপ প্রমাণ করে যে, ডাইনোসরের
যুগেও বড় আকারের সাপ ছিল।
দীর্ঘ সময় ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে থাকা 'সাপের উৎপত্তি
স্থল না কি জল'—এই বিতর্কের সমাধানে নাজাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি
ভূমিকা পালন করেছে। যদিও এই সাপটি বর্তমানে বিলুপ্ত, তবে বিবর্তনের
ধারায় সাপের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানোর প্রক্রিয়াটি বুঝতে এটি আজও গবেষকদের অন্যতম
প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।