ফাইনম্যান সেই সময়ে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা "There's Plenty of Room at the Bottom" -এ ন্যানোস্কেলের
প্রযুক্তি নিয়ে একটি ভবিষ্যদ্বাণী
করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “The principles of
physics, as far as I can see, do not speak against the possibility of
maneuvering things atom by atom.” তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনা আজ পৃথিবী জুড়ে
ন্যানো-রোবটিক্সের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
ন্যানো-রোবট কী? ন্যানো-রোবট হল
একটি অতিক্ষুদ্র যন্ত্র যা খালি চোখে দেখা অসম্ভব। এটি এক মিলিমিটারের লক্ষ ভাগের
এক ভাগ (ন্যানোমিটার) আকারের হতে পারে। এদের আকার এতটাই ছোট যে, আমাদের মাথার একটি চুলে আড়াআড়ি প্রায় এক লক্ষ
ন্যানো-রোবট পাশাপাশি বসানো সম্ভব!
১৯৭৪ সালে জাপানি অধ্যাপক নোরিও তানিগুচি প্রথম 'ন্যানো-টেকনোলজি' শব্দটি ব্যবহার
করেছিলেন। ন্যানো-টেকনোলজিতে ন্যানো-রোবটিক্সের
ধারণাটি প্রথমদিকে যাদুর মতো মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা ধীরে
ধীরে এই অদৃশ্য জাদুকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে
রোবটিক্স বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিকভাবে 'ন্যানো-রোবট' শব্দটি ব্যবহার শুরু করেন এবং ২০০০-এর দশকের
শুরু থেকে ন্যানো-রোবটিক্সের আধুনিক গবেষণা ও বাণিজ্যিক প্রয়োগ শুরু হয় ।
ফাইনম্যান বক্তৃতা দেওয়ার সময়েই তাঁর সহযোগী অ্যালবার্ট
হিবসকে বলেছিলেন , এই ক্ষুদ্র
ক্ষুদ্র যন্ত্রগুলো একদিন শরীরের ভেতর ঢুকে চিকিৎসকের মতো রোগ নিরাময় করতে পারবে।
ফাইনম্যান ভুল ছিলেন না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর প্রয়োজনীয়তা
উপলব্ধি করে ন্যানো-রোবটিক্স নিয়ে নিরন্তর গবেষনা শুরু হয়।১৯৯০-এর দশকে বিজ্ঞানী
এরিক ড্রেক্সলার এবং রবার্ট ফ্রেইটাস জুনিয়র চিকিৎসা ক্ষেত্রে
ন্যানো-রোবটের ব্যবহারের গাণিতিক ও তাত্ত্বিক রূপরেখা তৈরি করলেন। ১৯৯৯ সালে
ফ্রেইটাস 'Nanomedicine' নামে একটি বই
প্রকাশ করেন, যা এই গবেষণাকে একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা
দিয়েছিল। ন্যানো-প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে
ল্যাবরেটরিতে ক্ষুদ্রাকার প্রোটোটাইপ বা মডেল তৈরির কাজ পুরোদমে শুরু হয়। এই সময়ে
গবেষকরা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস বা ড্রাগ ডেলিভারির মতো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ
করতে শুরু করলেন।
ক্যান্সার চিকিৎসায় নির্ভুল নিশানায় ক্যান্সার কোষ ধ্বংস
করা মানবজাতির কাছে ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কেমোথেরাপির মতো প্রচলিত চিকিৎসায়
ক্যান্সারের কোষের পাশাপাশি সুস্থ কোষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে, এর ফলে রোগীর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা
দেয়। এখানেই ন্যানো-রোবট তার জাদু দেখাতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা ন্যানো-রোবটগুলোকে
এমনভাবে প্রোগ্রাম করলেন যেন তারা শরীরের সুস্থ কোষগুলোকে অক্ষত রেখে কেবল
ক্যান্সার কোষগুলোকে শনাক্ত করতে পারে। একবার ক্যান্সার কোষ শনাক্ত হলে, এই রোবটগুলো সরাসরি সেখানে ড্রাগ বা ঔষধ পৌঁছে
দিতে পারে, এমনকি কোষের ডিএনএ পরিবর্তন করে তাকে ধ্বংসও
করতে পারে।
ন্যানো-রোবটের ক্ষমতা কেবল ক্যান্সার চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ত্রোপচারবিহীন জটিল রোগের
সমাধানেও এর ভূমিকা বিশাল। মস্তিষ্কের রক্তনালীতে জমাট বাঁধা রক্ত স্ট্রোকের
অন্যতম কারণ। প্রচলিত চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার আজও ঝুঁকিপূর্ণ। ন্যানো-রোবটগুলো
সরাসরি জমাট বাঁধা স্থানে পৌঁছে সেটি দ্রবীভূত করে দিতে পারে, যেটি রোগীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে। সেই
ন্যানো-রোবটগুলো এখন স্বয়ংক্রিয়ই হয়ে ওঠেনি, হয়ে উঠেছে
জীবন্তও।
টাফটস ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্ট -এর একদল
জীববিজ্ঞানী ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এই ন্যানো প্রযুক্তির হাত ধরে ব্যাঙের কোষ থেকে ‘জেনোবট’ নামের এক অভিনব, ক্ষুদ্র এমন এক জৈব রোবট
তৈরি করেছেন, যেটি নিজে নিজেই দ্রুত এবং দক্ষভাবে চলাফেরা
করতে পারে, ভারি বস্তু ঠেলে নিয়ে যেতে পারে। শুধু তাই নয়
অন্যান্য রোবটের সাথে দলবদ্ধভাবে কাজ করার এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজেদের সারিয়েও
তুলতে পারে।
জেনোবট কোনো গতানুগতিক রোবট নয়, আবার সাধারণ কোনো প্রাণীর নয়। জেনোবট হল একটি
জীবন্ত যন্ত্র, বা বলা যায় এটি একটি “প্রোগ্রামেবল জীবন্ত
সত্তা”, যা মানুষের তৈরি ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করে।
রোবটটি তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণভাবে ব্যাঙের 'স্টেম সেল' থেকে। রোবটটিতে কোনো যান্ত্রিক পার্টস বা মেটাল
নেই। যেহেতু এটি কোষ দিয়ে তৈরি, কাজ শেষে এটি
প্রাকৃতিকভাবেই পচে যায়, ফলে কোনো বর্জ্যও
তৈরি হয় না। বিজ্ঞানীরা আফ্রিকান ব্যাঙের (Xenopus laevis) ভ্রূণ থেকে স্টেম সেল
সংগ্রহ করে কোনো জেনেটিক পরিবর্তন ছাড়াই রোবোটটির নির্দিষ্ট আকার দিয়েছেন । এই ব্যাঙের বৈজ্ঞানিক নাম থেকেই এর নাম হয়েছে 'জিনোবট' । রোবটটিতে সিলিয়া
বা চুলের মতো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তন্তু ব্যবহার করা হয়েছে। এই সিলিয়াগুলো মোটরের মতো
কাজ করে, যা রোবটটিকে জলের নিচে দ্রুত সাঁতার কাটতে
সাহায্য করে এবং হৃদপিণ্ডের কোষের
সংকোচনের মাধ্যমে রোবটটি নিজে নিজেই সাঁতার কেটে বা হেঁটে এগিয়ে যেতে পারে।
রোবোটিক্সের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্মৃতি ধারণ করার
ক্ষমতা এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে রোবটের কার্যকলাপ ও আচরণ পরিবর্তন করা। এই
বিষয়টি মাথায় রেখে, টাফ্টসের
বিজ্ঞানীরা জেনোবটগুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছেন যাতে এগুলোর এক বিট তথ্য রেকর্ড করার
জন্য রিড/রাইট ক্ষমতা থাকে। এই জন্য রোবোটটির কোষে একটি 'ফ্লুরোসেন্ট রিপোর্টার প্রোটিন' যোগ করেছেন তারা। এটি নির্দিষ্ট তরঙ্গের আলোতে
পড়লে এরা রঙ পরিবর্তন করতে পারবে। এর মাধ্যমে রোবটটি কোনো বিশেষ পরিবেশ বা
রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে সেটি মনে রাখতেও
পারবে। পরিণত জেনোবটগুলোতে এখন একটি অন্তর্নির্মিত ফ্লুরোসেন্ট সুইচ রয়েছে যা
প্রায় ৩৯০ ন্যানোমিটারের নীল আলোর সংস্পর্শ রেকর্ড করতে পারে।আণবিক স্মৃতির এই
মূলনীতি ভবিষ্যতে কেবল আলোই নয়, বরং তেজস্ক্রিয়
দূষণ, রাসায়নিক দূষক, ওষুধ বা কোনো
রোগের উপস্থিতি শনাক্ত ও রেকর্ড করার জন্যও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।
রোবটটি তৈরি করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি 'এআই (AI) অ্যালগরিদম' ব্যবহার করেছেন। প্রথমে সুপারকম্পিউটারে কয়েক
হাজার কাল্পনিক ডিজাইন পরীক্ষা করে দেখা হয়, জেনোবটের কোন
আকৃতিটি সবচেয়ে ভালো কাজ করবে। সেটি নিশ্চিত হওয়ার পরেই বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে
কোষগুলো দিয়ে বাস্তবে সেই আকার দেন। যেহেতু এটি জীবন্ত
টিস্যু দিয়ে তৈরি, তাই রোবটটি কেটে
গেলে বা ছিঁড়ে গেলে কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের কোষ ব্যবহার করে ক্ষত
সারিয়ে নিতে পারে। যখন টাফ্টসের বিজ্ঞানীরা জিনোবটগুলোর ভৌত কাঠামো তৈরি করছিলেন, তখন ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্ট-এর বিজ্ঞানীরা
জিনোবটগুলোর বিভিন্ন আকৃতির কম্পিউটার সিমুলেশন চালাতে ব্যস্ত ছিলেন, যাতে দেখা যায় যে সেগুলো এককভাবে এবং
দলবদ্ধভাবে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ প্রদর্শন করছে কি না। ইউনিভার্সিটি অফ ভারমন্ট-এর
অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং কোরের ডিপ গ্রিন সুপারকম্পিউটার ক্লাস্টার ব্যবহার করে, কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ জশ
বনগার্ডের নেতৃত্বে দলটি একটি ইভোলিউশনারি অ্যালগরিদমের সাহায্যে লক্ষ লক্ষ
এলোমেলো পরিবেশগত পরিস্থিতিতে এই সিমুলেশনগুলো চালিয়েছিল।
তাদের এই নতুন গবেষণার ফলাফল
‘সায়েন্স রোবোটিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। বনগার্ড বলেছেন, "আমরা চাই জেনোবটগুলো দরকারি কাজ করুক। এই
মুহূর্তে আমরা তাদের সহজ কাজ দিচ্ছি, কিন্তু
চূড়ান্তভাবে আমাদের লক্ষ্য হলো এক নতুন ধরনের জীবন্ত যন্ত্র তৈরি করা, যা উদাহরণস্বরূপ, সমুদ্র থেকে
মাইক্রোপ্লাস্টিক বা মাটি থেকে দূষক পদার্থ পরিষ্কার করতে পারবে।”
জিনোবট প্রচলিত রোবটের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। আগামীদিনে এই
রোবটটি ক্যান্সার, আলজাইমার বা
ধমনীর ব্লকেজ সারাতেও বড় ভূমিকা নেবে বলে বিজ্ঞানীরা
আশা প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে গবেষকরা জিনোবটের ক্ষমতা আরও উন্নত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা চেষ্টা করছেন যাতে জিনোবট আরও দীর্ঘ সময়
বেঁচে থাকতে পারে, আরও জটিল কাজ
করতে পারে এবং পরিবেশের সাথে আরও কার্যকরভাবে অভিযোজিত হতে পারে।