akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

বৈজ্ঞানিকের রান্নাঘর - ১৮ । শ্রাবণ ১৪৩৩



ভিনদেশী ভিনিগার











অরূপ

বন্দ্যোপাধ্যায়

এন সি আর, দিল্লি

আগের দিনটা বড়ো মনখারাপে কেটেছে রিয়ার। অর্কর ডাক এসেছে কলকাতা থেকে। দিল্লির সব কাজ তার শেষ আপাতত।

কয়েকটা আরও কয়েকটা দিন দিল্লিতে কাটিয়ে যেতে পারলে ভালো হত বলে মনে হলেও অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফেরার টিকিট কাটতে হল। অর্কর রিসার্চ গাইড বিদেশ চলে যাবেন খুব শিগগির। তাই থিসিস সম্পূর্ণ করে জমা করতে হবে।

চলে যাবার আগে দাদাকে নিজের হাতে চিলি-চিকেন করে খাইয়েছে রিয়া। সঙ্গে প্রন ফ্রায়েড রাইস করেছেন রিয়ার মা। অর্ক খেতে ভালোবাসে বলে আনানো হয়েছিল রাবড়ি আইসক্রিম। খাওয়াদাওয়ার পর বাগানে বসে ছিল দুই ভাইবোন। দুজনে স্মৃতিচারণ করেছিল কলকাতা আর দিল্লির মধুর সব মুহূর্ত। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দুজনেই ঘুমোতে গিয়েছিল। কিন্তু সকালে উঠেই জানা গেল মিনুমাসি নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

রিয়া ভিতর থেকে খোঁজ নিয়ে এসে অর্ককে জানায়, মিনুমাসি ভোররাত থেকে বার বার টয়লেট যাচ্ছেন, তাঁর নাকি স্টমাক আপসেট। অর্ক সেই খবর শুনে বলে, “অ্যাংসাইটি অ্যাটাক। প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার জন্য অনেকেরই হয়ে থাকে।”

রিয়ার মা শুকনো মুখে ওদের জানান, “দিদি কিন্তু সব দোষ দিয়েছে গতরাতের চিলি-চিকেনকে। বলছে, ভিনিগার পচে গিয়েছিল, সেই ভিনিগার দিয়ে রিয়া চিলি-চিকেন রেঁধেছে, আর তাতেই নাকি পেট গড়বড় হয়েছে।”

অর্ক হো হো করে হেসে ওঠে।— “বলো কী মামি, ভিনিগার পচে যায়? আরে অ্যালকোহল পচিয়ে ভিনিগার বানানো হয়, আর মিনুমাসি কিনা বলে ভিনিগার পচা? ভিনিগারকে পচাবে কার সাধ্য? ওটা তো একটা মৃদু অ্যাসিড। এতটা কড়া নয় যে একেবারে পেটখারাপ করিয়ে ছাড়বে। আর বাড়িতে আমরাও তো একই খাবার খেলাম, তাহলে আমরা কেন অসুস্থ হলাম না?”

“কী জানি বাপু, ভিনিগার রান্নায় দেয় জানি, সেটা অ্যাসিড নাকি অ্যান্টাসিড জানব কেমন করে?” হতাশ লাগে রিয়ার মায়ের গলা।

অর্ক ব্যাপারটা সামলে দেবার জন্য বলে, “আমার মাকে ফোন করে ওষুধ জেনে নিচ্ছি। মা তো ডাক্তার। সে-ই বলুক, ভিনিগার পচে কি না। আমার মতো অর্থশাস্ত্রীর কথা কে আর শোনে!”

রিয়া হেসে উঠে বলে, “বাব্বা, অর্কদা, তুমি তো দিল্লিতে এসে বেশ কঠিন হিন্দি শিখে গিয়েছ! ইকোনমিস্টকে যে ভালো হিন্দিতে অর্থশাস্ত্রী বলে সেটাও জেনে গিয়েছ। এবার তুমি হিন্দিতে পাশ করে গেলে। যাক, এবার পিসিকে ফোন করে জেনে নাও ওষুধ। পাড়ার ওষুধের দোকান এত সকালে খোলে না। গাড়ি বার করতে হবে, হাসপাতালের কাছে ওষুধের দোকানগুলো চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে। দেরি নয়, বেরিয়ে পড়ি।”

অর্কর মা ওষুধের নাম হোয়াটস-অ্যাপ করে দেন। অর্ক আর রিয়া বেরিয়ে পড়ে ওষুধ কিনতে। রিয়া রাস্তা দেখায়, অর্কর হাতে স্টিয়ারিং।

“ভিনিগারের কেমিক্যাল নাম কী বল দেখি রিয়া?” গাড়ি চালাতে চালাতে অর্ক প্রশ্ন করে।

“অ্যাসেটিক অ্যাসিড। সি.এইচ.-থ্রি-সি.ও.ও.এইচ।”

“পাশ। কেমন করে বানায় ভিনিগার?”

“ইস্ট ব্যবহার করে সুগার ফারমেন্ট করলে পাই অ্যালকোহল। আর অ্যালকোহল অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে বদলে যায় অ্যাসিডে। ইথাইল অ্যালকোহল রাসায়নিক বিক্রিয়া করে বদলে যায় অ্যাসিটিক অ্যাসিডে। এবার জলে ডাইলিউট করে তৈরি হয়ে গেল ভিনিগার।”

“তোর বিজ্ঞানী হওয়া ঠেকায় কে। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী বারো ক্লাসের পরীক্ষার পর স্রেফ ভুলে মেরে দেয় ইস্কুলে শেখা বিদ্যেগুলো। রান্নাঘরে আমরা যে রঙবিহীন ভিনিগার ব্যবহার করি, তাতে মাত্র পাঁচ শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিড থাকে। এতে মিনুমাসির পেটখারাপ হওয়ার কারণ দেখি না। পচে না গিয়ে বরং ভিনিগার পচার হাত থেকে বাঁচায় খাদ্যবস্তুকে। ভিনিগার ব্যবহার না করে রেখে দিলেও নষ্ট হবার কোনও কারণ নেই। হয়তো তার স্বাদের কিছু পরিবর্তন হতে পারে।”

“একদম তাই, অর্কদা। ভিনিগার ব্যবহার করা হয় খাদ্যবস্তুদের জীবাণু সংক্রমণ হয়ে পচে যাবার হাত থেকে বাঁচাতে।” রিয়া জোরের সঙ্গে বলে।

“কত বছর ধরে মানুষ ভিনিগার ব্যবহার করছে বলতে পারিস?” অর্ক প্রশ্ন করে।

“অন্তত কয়েকশো বছর নিশ্চয়ই?”

“খ্রিস্টের জন্মের প্রায় পাঁচ হাজার বছর বা তারও আগে থেকে সম্ভবত। পণ্ডিতদের মতে, ব্যাবিলনে নাকি ভিনিগারের আবিষ্কার হয়, তাও নেহাত আকস্মিকভাবে। মধু বা আঙুরের মিষ্টি রস অনেকদিন রেখে দিলে যে সেটা টক হয়ে যায়, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ করে। তারপর দেখা যায় এইভাবে তৈরি হওয়া ভিনিগার ফল বা শাকসবজিকে কিছুদিন টাটকা রাখতে পারে। শোনা যায়, গ্রিস এবং রোমে আহত সৈনিকদের ক্ষত সারাবার জন্য ভিনিগার ব্যবহার করা হত। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রিটসের লেখা বইতে এই পদ্ধতির হদিস পাওয়া যায়।”

ওষুধের দোকানের দিকে গাড়ি ঘোরাতে ইশারা করে রিয়া বলে, “কিন্তু মিনুমাসি এইসব বৈজ্ঞানিক কথাতে বিশ্বাস করবেন না বলেই মনে হয়। যাই হোক, ওষুধ কিনে ফিরে যাই বরং। তোমার কলকাতা ফেরার টিকিট কি কাটা হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, মিনুমাসির অস্ট্রেলিয়া যাত্রার আগেই আমি চলে যাচ্ছি। পরশু বিকেলের রাজধানী এক্সপ্রেস। ট্রেনে ঘুমাতে ঘুমাতে চলে যাব।”

অর্ক গাড়ি পার্ক করে, রিয়া নেমে যায় ওষুধ কিনতে। দিল্লি শহরটা অর্কর ভালো লেগে গেছে। হয়তো একদিন সে কোনও চাকরি নিয়ে এই শহরেই ফিরে আসবে। রয়ে গেল নানা ঐতিহাসিক জায়গা দেখা। হয়তো যখন সে ফিরে আসবে, রিয়া তখন সত্যি সত্যি কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার দিকে।

রিয়াকে ওষুধ নিয়ে ফিরে আসতে দেখে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করে অর্ক।


  

(ক্রমশ)

 

সূচিপত্র

  

আরও পড়ুন  -


+ মাইক্রো-ওয়েভের মায়াবী দুনিয়া
+ নন-স্টিকের নানা দিক
+ ওয়াটার ফিল্টার
+ আজকের মোটো, আজিনোমটো
+ তুলতুলে তেলেভাজা
+ ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল
+ মামলায় ঝোলে বাটার চিকেন
+ চার চার নয়, শক্তির হোক জয়
+ চিপস নয় তো চিপ
+ আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো
+ ইনডাকশন কুকারের কেরামতি
+ অন্ত্র তো নয় যন্ত্র
+ খাবারের গায়ে কেন টক টক গন্ধ
+ জল শুধু জল
+ ফ্রাই, কিন্তু ড্রাই নয়
+ যার নুন খাই, তার গুণ গাই
+ কুসুমে কুসুমে
......
+ পাখিদের জি পি এস

সূচিপত্র