তেমন আবার হয় নাকি? পোকামাকড়ের অ্যান্টেনা! অ্যান্টেনা বলতেই আমাদের মনে আসে টেলিভিশনের কথা। বাইরের সিগন্যাল ধরতে টেলিভিশনে ব্যবহার করা হয় অ্যান্টেনা। ধাতুর তৈরি। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ধরতে পারে আবার ছড়িয়ে দিতে পারে।
আমরা ভুলে যাই, আরেক রকম অ্যান্টেনার কথা।
পোকামাকড়দের শুঁড়, ওটাই অ্যান্টেনা। কীট পতঙ্গের অ্যান্টেনা নিয়েই এই লেখা। অ্যান্টেনা একজোড়া সংবেদনশীল অঙ্গ; পতঙ্গের মাথার উপর বসানো থাকে। সেটি দিয়ে বহু রকম কাজ করে
পোকা মাকড়। গ্রিক শব্দ অ্যান্টেনা। ইটালির বিজ্ঞানী মারকোনি
পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন (১৮৯৫) শব্দটি। কিন্তু জীববিজ্ঞানে ‘অ্যানটেনা’র ব্যবহার খুবই প্রাচীন।
পতঙ্গ-বিদ্যায় শব্দটির অর্থ, পোকাদের মাথায় লাগানো লম্বা
সরু সংবেদনশীল অঙ্গ। প্রকৃতির বুকে কীটপতঙ্গের সংখ্যা প্রচুর। বৈচিত্রে ভরপুর
প্রাণী, পতঙ্গ। বিভিন্ন উপায়ে শিকার করে, বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে অ্যান্টেনা। বংলায় শুঁড়। খুবই সংবেদনশীল এক অঙ্গ। বহু রকম কাজ করে পোকা মাকড়দের অ্যান্টেনা। পরিবেশ কেমন, বুঝে নেয়। খাদ্য খোঁজা, শিকারিদের আক্রমণ থেকে
রক্ষা পাওয়া, অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। যাবতীয় কাজ সমাধা করে
অ্যান্টেনা।
কখনও আমাদের চোখে ধরা পড়ে না কীট পতঙ্গের মাথায় থাকা
অ্যান্টেনা। কখনও আবার দেখতে পাই সরু সুতোর মত শুঁড়। কয়েক ইঞ্চি লম্বা অবধি হয়।
সুতোর মত দেখতে হোলেও, অ্যান্টেনা তৈরি অনেক গুলো অংশ দিয়ে। স্ক্যাপ (Scape), পেডিসেল (Pedicel), ফ্ল্যাজেলাম (Flagellum)। পতঙ্গের মাথার
সঙ্গে অ্যান্টেনা সংযুক্ত হয়ে থাকে স্ক্যাপ অংশটি দিয়ে। পরের অংশ পেডিসেল।
মাঝখানের অংশটি, স্ক্যাপ ও ফ্ল্যাজেলামকে জুড়ে রাখে। ফ্ল্যাজেলাম অংশটা
সবচেয়ে লম্বা, নমনীয়। ছোট ছোট অনেক খণ্ডে বিভক্ত। পোকামাকড়ের প্রজাতিভেদে অ্যান্টেনার গঠন, আকৃতি ভিন্ন রকম হয়। পিপড়ের অ্যান্টেনা বাঁকানো, মথের অ্যান্টেনা ঝুঁটির মতো (plumose)। আবার কিছু
পোকামাকড়ের অ্যান্টেনা বেশ মোটা।
সংবেদনশীল অঙ্গ অ্যান্টেনা দিয়ে বহু রকম কাজ করে পতঙ্গ
বাহিনী। অ্যান্টেনার গায়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম সংবেদন রিসেপ্টর (receptors) থাকে। এর সাহায্য নিয়েই করে অনেক রকম কাজ। রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি বুঝতে পারে। বাইরের তাপ, স্পর্শজনিত সংকেত গ্রহণ করে বুঝে নেয় বস্তুটিকে। খুব সফল
ভাবে গন্ধ চিনতে পারে অ্যান্টেনা। অনেক পোকামাকড় অ্যান্টেনার সাহায্যে ফেরোমোন (pheromone) শনাক্ত করে নেয়। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী অন্যের সঙ্গে
যোগাযোগ রাখার জন্য ফেরোমোন রাসায়নিকটি ব্যবহার করে। যেমন কোনো পুরুষ মথ, নারী মথের নির্গত ফেরোমোন দূর থেকে অ্যান্টেনা দিয়ে শনাক্ত
করে নিতে পারে। অ্যান্টেনা দিয়ে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি অনুভব করতে পারে পতঙ্গরা। যেমন, মশা তার অ্যান্টেনার সাহায্য নিয়ে উষ্ণ-রক্ত প্রাণীদের চিনে
নেয়। তারপর সেই প্রাণীর রক্ত খাওয়া শুরু করে। পোকামাকড়ের অ্যান্টেনায় রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। মৌমাছি, পিপড়ের মতো সামাজিক পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে, শুধু পরিবেশ অনুভব করা নয়, পরস্পরের সঙ্গে
যোগাযোগ রাখবার কাজেও ব্যবহার হয় অ্যান্টেনা। জলচর পোকামাকড়ের অ্যান্টেনা আবার
ভিন্ন রকম। জলের নিচে কাজ করবার উপযোগী। কিছু পোকামাকড়ের অ্যান্টেনা এতটাই সংবেদনশীল যে সামান্য
পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতিও দূর থেকে বুঝে নিতে পারে। যেমন, পুরুষ সিল্ক মথ মাত্র একটা ফেরোমোন অণুর উপস্থিতিও শনাক্ত
করতে পারে।
কীট পতঙ্গের অ্যান্টেনা শুধু সংবেদনশীল নয়। এক আশ্চর্য
অঙ্গ। পোকামাকড়ের বেঁচে থাকবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। এর সাহায্য নিয়েই
তারা পরিবেশে টিকে থাকে। গন্ধ, স্পর্শ, তাপমাত্রা, অন্যান্য সংকেত শনাক্ত করে
শিকার ধরে, বেঁচে থাকে। গঠন ব্যবহার প্রজাতিভেদে ভিন্ন হলেও, অ্যান্টেনার কার্যকারিতা পোকামাকড়দের বেঁচে থাকবার এক
অপরিহার্য অঙ্গ।
আরও পড়ুন -
+ গাছের ভাষা
+ জোনাকি জ্বলে মিটিমিটি
+ খুব ছোট ক্ষমতায় সূর্যেরও বেশী
+ গলগি
+ বোতল ব্রাশ
+ ফুলের কেন এত রঙ
+ ডাকটিকিটে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ...
+ প্রকৃতির ফাঁদ
+ বিজ্ঞান দিবস ও ভারতের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী
+ হাড়গিলা কি বিলুপ্ত পাখি
+ মাইক্রোবায়োলজি আর মাইক্রোস্কোপ
+ রহস্যে মোরা গিরগিটি
+ হাঁস নিয়ে অন্য কথা
|