প্রকৃতি তাদের এমন লম্বা গলা দিয়েছিল যাতে তারা আফ্রিকার
উঁচু উঁচু একাশিয়াগাছের মগডালের কচি পাতাগুলো সহজে পেড়ে খেতে
পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো প্রাণীই সম্ভবত জিরাফের চেয়ে বেশি উঁচুতে মাথা তুলে
রাখতে পারেনা।
তৃণভোজী এই
প্রাণীটি এতদিন মানুষের কাছে পরিচিত ছিল তাদের শরীর জুড়ে অসাধারণ নকশার জন্য। জিরাফের শরীরের
এই জ্যামিতিক নকশা বা ছোপগুলো তাদের শরীর জুড়ে অসাধারণ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।
গায়ের নকশার আকার ও রঙের গাঢ়ত্ব দেখেই জিরাফদের প্রজাতিগত ভাবে আলাদা করা যায়।
মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন একজনের সাথে অন্যজনের মেলে না, তেমনই দুটি জিরাফের গায়ের নকশাও কখনো এক রকম হয়
না।
বিজ্ঞানীরা এতদিন জানতেন জিরাফ তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়
দাঁড়িয়েই কাটায়, এমনকি তারা
দাঁড়িয়েই ঘুমায়! তাদের পা গুলো দেখতে সরু মনে হলেও সেগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। বিজ্ঞানীরা এটাও জানতেন যে তাদের
দৃষ্টিশক্তি অবিশ্বাস্য এবং এই দৃষ্টিশক্তি প্যানোরামিক। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী
প্রাণীর চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত তাদের দৃষ্টি শক্তি। এই
কারনেই তারা বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পায়।
কিন্ত, বিজ্ঞানীরা এটা
জানতেন না যে মানুষ বা শিম্পাঞ্জির মতো সাধারণ গাণিতিক
হিসাব করতে পারে জিরাফও। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জিরাফ সম্পর্কে
আগে যে ধারনা করা হতো তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান ওরা। ওদের বুদ্ধি দেখে অবাক হয়ে
গেছেন তারা। এতদিন মনে করা হতো শরীরের তুলনায় জিরাফের
মস্তিষ্ক ছোট হওয়ায় এরা খুব একটা বুদ্ধিমান নয়, কিন্তু নতুন একটি
তথ্য বিজ্ঞানীদের এই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
বার্সেলোনার একদল গবেষক সম্প্রতি এদের নিয়ে একটি গবেষণা
করেছিলেন। সেই গবেষনাতেই তারা দেখেছেন জিরাফেরা শুধু
সংখ্যার হিসাবই রাখতে পারে না, কোনো পাত্রে
খাবারের পরিমাণ কমলে বা বাড়লে তারা সেই পরিবর্তনও সহজে বুঝতে পারে।
একা বার্সেলোনা নয়, ইউনিভার্সিটি অব
বার্সেলোনা, ইউনিভার্সিটি অব লিপজিগ এবং ম্যাক্স প্লাঙ্ক
ইনস্টিটিউট অব ইভোল্যুশনারি অ্যানথ্রোপলজির গবেষকেরা যৌথভাবে এই গবেষণাটি
চালিয়েছেন। গবেষনার জন্য তারা বেছে নিয়েছিলেন বার্সেলোনার চিড়িয়াখানাকেই। সেখানে
তারা চারটি জিরাফকে বেছে নিয়েছিলেন তাদের গবেষনার জন্য, যাদের নাম ছিল নুরু, নজানো, নাকুরু ও
ইয়ালিঙ্গা। সেই গবেষনাতেই তারা পেয়েছেন জিরাফদের গাণিতিক ভাবনার চমকপ্রদ তথ্য।
তাঁদের এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে 'সায়েন্টিফিক
রিপোর্টস' সাময়িকীতে ।
গবেষকেরা প্রথমে চিড়িয়াখানার এই জিরাফদের সামনে থাকা দুটি পাত্রে ভিন্ন ভিন্ন
পরিমাণে গাজরের টুকরা রেখেছিলেন। পরীক্ষার শুরুতে পাত্র দুটি ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভেতরের গাজরগুলো দেখা না যায়। এরপর
জিরাফদের চোখের সামনেই কখনো সেই ঢাকা পাত্রগুলোর ভেতর আরও কিছু গাজরের টুকরা যোগ
করা হলো, আবার কখনো সেখান থেকে কিছু গাজর সরিয়ে নেওয়া
হলো। গবেষকেরা বলেছেন, এই পুরো
প্রক্রিয়াটিই জিরাফগুলো অত্যন্ত মনোযোগের সাথে খেয়াল করেছিল। তারা বুঝতে পারছিল যে, কোনো পাত্রে গাজরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর
কোনটিতে কমে যাচ্ছে।
দেখা গেছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ
ক্ষেত্রে জিরাফগুলো নির্ভুলভাবে সেই পাত্রটিই বেছে নিয়েছে, যেখানে গাজরের পরিমাণ বেশি ছিল। একবার নয়, গবেষকরা দেখেছেন বারবার পরীক্ষাতেও ফল একই
পাওয়া যাচ্ছিল। গবেষকদের ধারণা, গাজরের সংখ্যা
কমা বা বাড়ার এই হিসাবগুলো জিরাফরা তাদের মাথায় খুব ভালোভাবে জমা করে রেখেছিল।
জিরাফগুলো আসলে কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটি নিশ্চিত করার জন্য গবেষকেরা আরও কিছু পরীক্ষা চালান। তাঁরা দেখতে
চেয়েছিলেন, জিরাফরা কি সত্যিই সংখ্যার হিসাব করছে, নাকি গবেষকদের শারীরিক সংকেত বা হাতের নড়াচড়া
দেখে পাত্র বেছে নিচ্ছে। দেখা গেছে, চারটি জিরাফের
মধ্যে দুটি হয়তো গবেষকের হাতের স্পর্শের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল। তবে
বাকি দুটি জিরাফ কোনো ধরনের ইঙ্গিত ছাড়াই কেবল গাজরের পরিমাণ ও সংখ্যার হিসাব করে
সঠিক পাত্রটি বেছে নিতে থাকে।
এই গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, যোগ করার ক্ষেত্রে জিরাফরা মানুষের মতোই সাধারণ
কিছু গাণিতিক হিসাব বা সংখ্যা অনুধাবন করতে পারে। তবে বিয়োগ বা গাজর সরিয়ে নেওয়ার
মতো কঠিন হিসাব বুঝতে তাদের কিছুটা বেগ পেতে হয় বিয়োগ করার ক্ষেত্রে তাদের সঠিক
উত্তর দেওয়ার হার একেবারেই সাধারণ ৫০-৫০ চান্সে নেমে আসে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, বাচ্চাদের মতো প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সংখ্যা মনে
মনে যোগ করার চেয়ে বিয়োগ করা বা বাদ দেওয়াটা অনেক বেশি জটিল মানসিক প্রক্রিয়ার অংশ।
গবেষকেরা তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকা পাত্রের ভেতরে গাজর যোগ করার পর দুটি
ভিন্ন পরিমাণকে মনে মনে মিলিয়ে জিরাফদের সঠিক
পাত্র বেছে নেওয়ার এই ক্ষমতাটি আসলে মানুষের যোগ
করার প্রক্রিয়ার
সাথে তুলনীয়। এটি প্রমাণ করে যে, জিরাফদের
মস্তিষ্কে এমন একটি জ্ঞানীয় ভিত্তি (cognitive
foundation) রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও
জটিল গাণিতিক হিসাব বুঝতে সক্ষম হবে।
জিরাফদের এই অসাধারণ ক্ষমতা প্রাণিজগতের বুদ্ধিমত্তা ও
গাণিতিক দক্ষতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগের সমস্ত ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। গবেষনা দল
প্রধান গবেষক ইকার লোইদি বলেছেন, "এই ফলাফল আমাদের
মনের মধ্যে থাকা অতিরিক্ত 'নৃতাত্ত্বিক
অহংকার' (anthropocentric view) বা মানুষকে সব
বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্রবিন্দু ভাবার প্রবণতাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে
দিয়েছে। প্রাণিজগতের মন ও চিন্তাভাবনা কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা সঠিকভাবে বুঝতে
হলে আমাদের আরও বিভিন্ন ধরনের প্রাণী ও প্রজাতির ওপর এমন গবেষণা করা উচিত।"
বিজ্ঞানীদের অনুমান, জিরাফদের এই
গাণিতিক বা সংখ্যা অনুমানের দক্ষতার পিছনে রয়েছে তাদের টিকে থাকার লড়াই। জিরাফরা
বুনো পরিবেশে এমন দলে বাস করে যা প্রতিনিয়ত ভেঙে ছোট ছোট উপদলে ভাগ হয়ে যায় এবং
পরিবেশের কারণে আবার একজায়গায় সমবেত হয়। তারা যেখানে থাকে, সেই সাভানা অঞ্চলে তাদের প্রধান খাদ্য 'একাশিয়া' (Acacia) গাছগুলো চারদিকে
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। তাই কোন অঞ্চলে, কখন, এবং কী পরিমাণে খাবার পাওয়া যেতে পারে—তা
অনুমান করার এই মানসিক তাগিদ থেকেই জিরাফদের মধ্যে এই গাণিতিক দক্ষতার বিবর্তন
ঘটেছে।
বিজ্ঞানীরা এখন নতুন করে ভাবছেন, সংখ্যার ধারণা কেবল মানুষের একচেটিয়া নয়, বরং বন্য প্রাণীদের মধ্যেও এটি প্রাকৃতিকভাবে
বিদ্যমান থাকতে পারে। তারা আশা করেছেন এই আবিষ্কার আগামীদিনে প্রাণীদের মস্তিষ্কের
গঠন এবং তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার মূল্যায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।