এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব-প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন অন্বেষণ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই ধারাবাহিকে।
ছিদ্র
( খ্রি স্ট পূ র্ব ৩৫, ০ ০ ০ )
| | প র্ব - ৮
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ছিদ্র বা কোনও বস্তুকে ফুটো করার প্রযুক্তি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
আজকের আধুনিক যন্ত্রসভ্যতায় ড্রিল মেশিন, সূচ, করাত কিংবা
অস্ত্রোপচারের নানা সরঞ্জাম আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হলেও, এর সূচনা হয়েছিল
বহু হাজার বছর আগে আদিম মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩৫,০০০
খ্রিস্টপূর্বে মানুষ প্রথম উপলব্ধি করে যে, কোনও কঠিন বস্তুতে ছিদ্র তৈরি করা গেলে তা নানাভাবে কাজে
লাগানো সম্ভব। এই উপলব্ধিই পরবর্তীকালে প্রযুক্তির বিকাশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন
করে।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ
প্রথমদিকে সুতীক্ষ্ণ পাথর বা বর্শার মতো ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে কাঠ, পশুর মোটা চামড়া কিংবা অস্থিতে ছিদ্র করতে শিখেছিল। মূলত
শিকার, পোশাক তৈরি এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য এই কৌশলের
উদ্ভব ঘটে। পশুর চামড়ায় ছিদ্র করে তাতে লতা বা লিগামেন্ট প্রবেশ করিয়ে পোশাক তৈরি
করা সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে কাঠে ছিদ্র করে অস্ত্র বা সরঞ্জামের বিভিন্ন অংশ জোড়া
লাগানো যেত। অর্থাৎ, ছিদ্র করার কৌশল মানুষের নির্মাণ ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে
দিল এইবারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে
স্বাভাবিকভাবেই এই প্রাথমিক কৌশলের আরও উন্নতি ঘটে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার
কাষ্ঠশিল্পীরা ছিদ্র করার কাজে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল। তারা ধনুকের মতো
বাঁকানো কাঠ ও দড়ির সাহায্যে একধরনের ঘূর্ণনযন্ত্র তৈরি করেছিল, যা বর্তমানে ‘বো-ড্রিল’ নামে পরিচিত। এই যন্ত্রের মাধ্যমে কাঠ, পাথর এবং অন্যান্য পদার্থে তুলনামূলক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে
ছিদ্র করা সম্ভব হত। মিশরীয়রা মন্দির নির্মাণ, আসবাবপত্র এবং অলংকার তৈরির
কাজে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করত। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যান্ত্রিক ড্রিল প্রযুক্তির
এক আদিম রূপ হিসেবে বিবেচিত হয় এই যন্ত্র। মানুষ যে শুধু
নির্মাণকার্যে নয়, চিকিৎসাক্ষেত্রেও ছিদ্র করার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে
শিখেছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা গেছে, প্রায় ৯,০০০ খ্রিস্টপূর্বেই মানুষ
দাঁতে ছিদ্র করার কৌশল জানত। প্রাচীন মানব কঙ্কালের দাঁতে ক্ষুদ্র ছিদ্রের চিহ্ন
পাওয়া গেছে, যা থেকে অনুমান করা হয় যে দাঁতের চিকিৎসা বা ব্যথা উপশমের
উদ্দেশ্যে এই কৌশল অবলম্বন করা হত। এ মানব ইতিহাসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর
প্রাথমিক পদক্ষেপ। পরবর্তীকালে রোমান সভ্যতা
ছিদ্র প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর করে তোলে। রোমানরা ‘আগর’ বা
‘অগার’ নামে পরিচিত একধরনের
সর্পিলাকার যন্ত্র ব্যবহার শুরু করে। এই যন্ত্রের সাহায্যে কাঠে গভীর ও মসৃণ ছিদ্র
করা সম্ভব হল। নির্মাণকাজ,
জাহাজ তৈরি এবং সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতে এই প্রযুক্তি
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রোমানদের প্রকৌশল দক্ষতার পেছনে এই ধরনের উন্নত
ছিদ্রযন্ত্রের অবদান ছিল অপরিসীম।
এই সাধারণ ছিদ্র কৌশলই ধীরে
ধীরে আধুনিক যন্ত্রপ্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে তোলে। আজকের বৈদ্যুতিক ড্রিল, শিল্পকারখানার যন্ত্র, এমনকি মহাকাশ প্রযুক্তিতেও
এর প্রয়োজন অপরিহার্য। মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় তাই ‘ছিদ্র’ শুধুমাত্র এক কারিগরি
প্রক্রিয়া নয়; এ মানুষের সৃজনশীলতা, প্রয়োজনবোধ এবং প্রযুক্তিগত
বিবর্তনের এক উজ্জ্বল নিদর্শনও বটে।
(চলবে)
সূচিপত্র ..............
আ র ও প ড়ু ন - পর্ব - ১ । পাথরের যন্ত্রপাতি
পর্ব - ২ । নিয়ন্ত্রিত আগুন
পর্ব - ৩ । আশ্রয়
পর্ব - ৪ । পোশাক-পরিচ্ছদ
পর্ব - ৫ । বর্শা
পর্ব - ৬ । বড়শি
পর্ব - ৭ । হিসাবরক্ষক লাঠি |