akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

জ্ঞান বিজ্ঞান । জ্যৈষ্ঠ - আষাঢ় ১৪৩৩



রাজকাঁকড়া "জীবন্ত জীবাশ্ম" (Living Fossil)

নীল রক্তের প্রাণী












ড. সৌমিত্র চৌধুরী

কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ

 

রক্তের রং আবার নীল হয় নাকি? হয়, আমাদের চেনা অনেক প্রাণীই আছে যাদের রক্তের রং নীল। চিংড়ির রক্ত নীল, কাঁকড়ার রক্তও নীল। তবে মানুষ এবং প্রকৃতির চার পেয়ে জীবের শরীরে রক্তের রং লাল।

রক্তের রঙ কেন ভিন্ন রকম হয়? কারণ, রক্তের মধ্যে মিশে থাকে আলাদা রাসায়নিক পদার্থ। মানুষ আর জীবজন্তুর রক্তে আছে হিমোগ্লোবিন; লোহা (Fe, iron) আর পরফিরিনের সমন্বয়ী যৌগ (co-ordinaton complex)আর নীল রক্তের মধ্যে থাকে হিমসায়ানিন, এটিও এক সমন্বয়ী যৌগ। তৈরি হয়েছে তামা (Cu, copper) আর পরফিরিন নামের জৈব যৌগ দিয়ে। 

হিমোগ্লোবিনের আয়রন (Fe) হোক কিংবা হিমসায়ানিনের তামা (Cu), এদের কাজ মূলত একই রকম। বাতাসের অক্সিজেনকে রক্তের মধ্য দিয়ে শরীরের সব খানে পৌঁছে দেওয়া। 

রক্ত খুবই মূল্যবান। বহু ধরণের অসুখে সুস্থ মানুষের রক্ত অসুস্থ মানুষের দেহে পাঠানো হয়। মানুষ আবার নিজের প্রয়োজনে অন্য প্রাণীর রক্তকেও কাজে লাগায়। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পৃথিবী জুড়ে নীল রক্তের প্রবল চাহিদা। কোথা থেকে আসে এত নীল রক্ত

কাঁকড়ার শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয় নীল রক্ত। মানুষের বহু কাজে লাগে সেই রক্ত, রক্তের উপাদান। সেই বিষয়ে বলবার আগে নীল রক্তের প্রাণী, কাঁকড়া (Crab) সম্পর্কে কিছু কথা জানাই। 

বহু বছর আগে (৩০ কোটি), ডাইনোসোরাস আসেনি তখন, কাঁকড়া এসেছিল পৃথিবীর বুকে। প্রতিকুল পরিবেশে বেঁচে থাকবার অদ্ভুত ক্ষমতা এদের। প্রায় ছয় হাজার প্রজাতি কাঁকড়ার।  আর্থ্রোপোডা পর্বের এক রহস্যময় ক্রাস্টেসিয়ান প্রাণী এই কাঁকড়া। ছোট বড় বহু রকমের আকার এদের। শরীরের গঠন, চলন, জীবনযাত্রা অন্য প্রাণীদের থেকে একদমই আলাদা। কাইটিন আর খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি এদের পুরু বহিঃকঙ্কাল বা এক্সোস্কেলিটন। শক্ত কাঠামোর কঙ্কাল ভিতরের নরম অঙ্গগুলিকে রক্ষা করে। অধিকাংশ কাঁকড়ার থাকে দশটি পা। সামনের এক জোড়া পা বহু কাজ করে। শিকার ধরা, আত্মরক্ষা, খাদ্য গ্রহণের মত দরকারি কাজ সামনের পা দিয়েই করে । হাঁটা, সাঁতার কাটায় ব্যবহার হয় বাকি আটটি পা। সোজা সামনের দিকে না হেঁটে আড়াআড়ি ভাবে চলে কাঁকড়া। পৃথিবী জুড়ে সমুদ্রের লোনা জল, নদী পুকুরের মিষ্টি জল, এমনকি শুকনো ডাঙাতেও বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়ার দেখা মেলে। 

        বহু মানুষের প্রিয় খাদ্য কাঁকড়া। এর মাংসে প্রচুর প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, রিবোফ্ল্যাভিন, সেলেনিয়াম থাকে। কাঁকড়া চাষ ও রপ্তানি করা অনেক দেশের মূল কারবার। 

শুধু খাওয়া নয়, কাঁকড়ার নীল রক্ত মানুষ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে। হর্স শু ক্র্যাব নামের এক প্রজাতির শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয় খানিক নীল রক্ত। পরে প্রাণীটিকে সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সব প্রাণী সুস্থ হয়ে উঠতে পারে না। অন্তত কুড়ি শতাংশ প্রাণী রক্ত হারিয়ে, চোট আঘত পেয়ে মারা যায়। সংখ্যায় কমে আসছে এরা। 

কেন কাঁকড়ার রক্তের চাহিদা? এদের নীল রক্তে থাকে দামী এক উপাদান। নাম অ্যামিবোসাইট (Amebocyte)এক ধরণের প্রোটিন। কাঁকড়া-শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রধান অস্ত্র এই অ্যামিবোসাইট। বাইরের কোন ব্যাক্টেরিয়া শরীরে ঢুকে বিষাক্ত টক্সিন ছাড়লেই কাজ শুরু করে অ্যামিবোসাইট। টক্সিনের সাথে এক ধরণের জেল তৈরি করে এই প্রোটিন। এর ফলে কী হয়? আক্রমণকারি ব্যাক্টেরিয়ার টক্সিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। 

মহা মূল্যবান অ্যামিবোসাইট নামের প্রোটিনটি। হর্স শু প্রজাতির কাঁকড়া (Limulus polyphemus) থেকে সংগ্রহ করা এই প্রোটিন আমাদের খাদ্যে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়েছে কিনা জানতে ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষার নাম লিমলাস অ্যামিবসাইট লাইসেট (LAL, Limulus amebocyte lysate)বহু ওষুধ, ইঞ্জেকশনে তৈরিতেও কাজে লাগে অ্যামিবোসাইট নামের প্রোটিনটি। সমুদ্রের জীব বৈচিত্রে হর্স শু কাঁকড়ার বিশাল ভুমিকা রয়েছে। প্রাণীটি সংখ্যায় কমে গেলে মানুষও বিপদে পড়বে। 

 

সূচিপত্র




 

আরও পড়ুন  -

 

+ ধুপ- ধুনো

 + মুজ, দশাসই এক অদ্ভুত প্রাণী

+ পোকামাকড়ের অ্যান্টেনা

+ গাছের ভাষা

+ জোনাকি জ্বলে মিটিমিটি

+ খুব ছোট ক্ষমতায় সূর্যেরও বেশী

+ গলগি

+ বোতল ব্রাশ

+ ফুলের কেন এত রঙ

+ ডাকটিকিটে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ...

+ প্রকৃতির ফাঁদ

+ বিজ্ঞান দিবস ও ভারতের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

+ হাড়গিলা কি বিলুপ্ত পাখি

+ মাইক্রোবায়োলজি আর মাইক্রোস্কোপ

+ রহস্যে মোরা গিরগিটি

+ হাঁস নিয়ে অন্য কথা



সূচিপত্র