কোনো প্রাণী শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিতে নির্জীব পদার্থের আকার
ধারন করে (মিমিক্রি)। কোনো প্রানী শিকারি বা শত্রুর গায়ে বিষ ছিটিয়ে আত্মরক্ষা
করে। বিবর্তনের ইতিহাসে আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করেছে প্রাণীকুল। তেমনই একটি
প্রক্রিয়া অটোটমি (autotomy)। প্রাণ রক্ষার
গুরুত্বপূর্ণ
উপায়।
কেমন এই প্রক্রিয়া? কোনো প্রাণী
আক্রমণের মুখে পড়লে শরীরের একটি অংশ ত্যাগ করে শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করে।
এর নাম অটোটমি।
অটো মানে ‘নিজে’ (গ্রিক শব্দ) আর টমি মানে ‘কেটে ফেলা’।
অর্থাৎ, দেহের একটি অংশ নিজেই কেটে ফেলা। অনেক ধরণের
প্রাণী এই রকম করতে পারে। টিকটিকি, অক্টোপাস, বিশেষ প্রজাতির কাঁকড়া, কীট পতঙ্গ পারে এই রকম করতে।
টিকটিকি যদি বুঝতে পারে, শিকারি তার লেজ
ধরে ফেলেছে তখন অদ্ভুত কাণ্ড করে। লেজের একটা অংশ নিজেই কেটে ফেলে। কাটা লেজটি
কিছুক্ষণ নড়াচড়া করে। শিকারির মনোযোগ কাটা অংশের দিকে সরে যায়। সেই সুযোগে
টিকটিকি পালিয়ে যায়।
টিকটিকির শরীর এমনভাবে তৈরি যে বিপদের সময়, শিকারির খপ্পর থেকে বাঁচতে প্রাণীটি নিজের লেজ
ত্যাগ করে দিতে পারে। টিকটিকির কাটা
লেজ পরে আবার গজিয়ে যায়। অর্থাৎ পুনর্যোজন (regeneration) ঘটে সেই হারানো অঙ্গের। টিকটিকির লেজ দেহের যেখানে যুক্ত, পেশি ও হাড়ের গঠনের কারণে সেটি খুব সহজে আলাদা
হয়ে যেতে পারে। কাটা লেজ নড়াচড়া করে। কারণ, লেজের ভেতর থাকা
স্নায়ুতন্ত্র (nervous system) তখনও সক্রিয়
থাকে। মস্তিষ্ক থেকে সিগন্যাল না পেলেও, লেজের ভেতরে থাকা
রিফ্লেক্স নিউরোন (reflex neurons) নিজে নিজেই
কিছুটা সময় ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল পাঠাতে থাকে। এই কারণেই লেজটা কিছুক্ষণ (২-৩
মিনিট) নড়ে, লাফায়।
আরেক প্রাণী অক্টোপাস বাঁচবার প্রয়োজনে একটি হাত ছেড়ে
দিয়ে পালিয়ে যায়। কাটা হাতটি পরে আবার জন্মায়। আবার কাঁকড়ার কোনো একটি পা
আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই পা নিজে থেকেই ঝরে পড়ে। কিছু পোকামাকড় ডানার অংশ বা
পা ফেলে দিয়ে শত্রুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচায়। উভচর প্রাণী সালামান্ডার। তার লেজ, চোখ বা হৃৎপিণ্ডের অংশ পুনরায় গজিয়ে ওঠে।
স্টারফিশের একটি বাহু কেটে গেলে সেটি আবার গজিয়ে ওঠে। এমনকি একটি বাহু থেকেও একটি
সম্পূর্ণ স্টারফিশ তৈরি হতে পারে।
বহু প্রাণীর শরীরে অঙ্গের পুনর্যোজন ঘটে। কিন্তু
মানুষের ক্ষেত্রে হয় না। পায়ে গ্যাংগ্রিন (Gangrene) হলে পা কেটে বাদ
দিতে হয়। দুর্ঘটনায় হাত পা হারালে মানুষকে ওই অঙ্গ ছাড়াই কষ্ট নিয়ে বাঁচতে হয়।
ভারতবর্ষে ডায়াবেটিস রোগের কারণে প্রতি বছরে এক লক্ষ মানুষের পা কেটে ফেলতে হয়।
কাটা অঙ্গের পুনর্যোজন সম্ভব
হলে ভয়ঙ্কর কষ্টের হাত থেকে পরিত্রাণ পেত অসংখ্য মানুষ। তেমন কি সম্ভব নয়?
কাটা অঙ্গের পুনর্যোজন এখন অবধি সম্ভব হয়নি। কারণ মানব-শরীরে কোষের পুনর্যোজনের
ক্ষমতা খুবই কম। পুনর্যোজনের জন্য প্রয়োজন দ্রুত কোষ বৃদ্ধি। মানুষের ক্ষেত্রে কোষ
বৃদ্ধি প্রক্রিয়াটি খুবই নিয়ন্ত্রিত। দ্রুত কোষ বৃদ্ধি ঘটলে ক্যানসার সৃষ্টি হতে
পারে। তবুও কিছু অঙ্গে পুনর্যোজন ঘটে। চামড়া বা লিভারর
খানিক অংশ পুনরায় গজাতে পারে।
মানুষের অঙ্গ পুনর্যোজন নিয়ে গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়ে। বিভিন্ন রোগ কিংবা দুর্ঘটনায়
হাত-পা হারানো মানুষের প্রভূত উপকার ঘটবে ‘অঙ্গ পুনর্যোজন’ (limb generation) সম্ভব হলে। স্টেম সেল গবেষণা, জেনেটিক
ইঞ্জিনিয়ারিং, টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির উন্নতির মধ্য
দিয়ে ভবিষ্যতে হয়তো মানুষের অঙ্গ পুনর্যোজন সম্ভব হবে।
বিজ্ঞানীদের তেমনই আশা।